বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে ২০২৭ সালটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হতে চলেছে। কেবল দ্বিপাক্ষিক সিরিজ হিসেবেই নয়, বরং র্যাঙ্কিংয়ের সমীকরণ এবং ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপের সরাসরি অংশগ্রহণের টিকিট নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই বছরটি হবে বড় এক অগ্নিপরীক্ষা। র্যাঙ্কিংয়ের সেরা দশে টিকে থাকার লড়াইয়ে এই বছর বাংলাদেশ সবমিলিয়ে ২৩টি ওয়ানডে ম্যাচ খেলবে। এই মহাগুরুত্বপূর্ণ যাত্রার সবচেয়ে কঠিন ও রোমাঞ্চকর অংশটি হতে যাচ্ছে বছরের শেষভাগে নির্ধারিত দক্ষিণ আফ্রিকা সফর।
Table of Contents
ঐতিহাসিক জোহানেসবার্গে অভিষেক ও সেঞ্চুরিয়নে ফেরা
ক্রিকেট দক্ষিণ আফ্রিকা কর্তৃক ঘোষিত সূচি অনুযায়ী, বাংলাদেশ এই সফরে তিনটি ভিন্ন সংস্করণে স্বাগতিকদের মুখোমুখি হবে। সফরের মূল আকর্ষণ হচ্ছে আইসিসি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অন্তর্ভুক্ত দুটি টেস্ট ম্যাচ। আগামী ১৫ নভেম্বর জোহানেসবার্গের বিখ্যাত ওয়ান্ডারার্স স্টেডিয়ামে শুরু হবে প্রথম টেস্ট। উল্লেখ্য যে, এই ঐতিহাসিক মাঠে বাংলাদেশ দল এর আগে কখনোই সাদা পোশাকের ক্রিকেটে মাঠে নামেনি। ফলে জোহানেসবার্গে এটি হতে যাচ্ছে টাইগারদের অভিষেক টেস্ট।
এরপর ২৩ নভেম্বর সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট ম্যাচটি শুরু হবে সেঞ্চুরিয়নের সুপারস্পোর্ট পার্কে। দীর্ঘ ১৮ বছরের বিরতির পর এই ভেন্যুতে টেস্ট খেলতে নামবে বাংলাদেশ। সর্বশেষ ২০০৮ সালে এখানে লাল বলের ক্রিকেটে অংশ নিয়েছিল টাইগাররা। বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক দেশ হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকার কন্ডিশনে এই দীর্ঘ সফরটি মেহেদী হাসান মিরাজ ও তার দলের জন্য কন্ডিশনের সাথে মানিয়ে নেওয়ার এক সুবর্ণ সুযোগ।
নিচে বাংলাদেশ দলের আসন্ন দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের পূর্ণাঙ্গ সূচি তুলে ধরা হলো:
| তারিখ | ম্যাচের ধরন | ভেন্যু |
| ১৫–১৯ নভেম্বর | ১ম টেস্ট | জোহানেসবার্গ |
| ২৩–২৭ নভেম্বর | ২য় টেস্ট | সেঞ্চুরিয়ান |
| ১ ডিসেম্বর | ১ম ওয়ানডে | ইস্ট লন্ডন |
| ৪ ডিসেম্বর | ২য় ওয়ানডে | গাবেখা |
| ৭ ডিসেম্বর | ৩য় ওয়ানডে | কেপ টাউন |
| ১০ ডিসেম্বর | ১ম টি–টুয়েন্টি | কিম্বার্লি |
| ১২ ডিসেম্বর | ২য় টি–টুয়েন্টি | বেনোনি |
| ১৩ ডিসেম্বর | ৩য় টি–টুয়েন্টি | সেঞ্চুরিয়ন |
র্যাঙ্কিং ও বিশ্বকাপের সমীকরণ
২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে ও নামিবিয়ায়। স্বাগতিক দেশ হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকা ও জিম্বাবুয়ে সরাসরি খেলার সুযোগ পেলেও বাকি দেশগুলোকে র্যাঙ্কিংয়ের ভিত্তিতে কোয়ালিফাই করতে হবে। বাংলাদেশের জন্য সরাসরি খেলার শর্ত হলো আইসিসি ওয়ানডে র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ দশে অবস্থান নিশ্চিত করা। সফরের তিনটি ওয়ানডে ম্যাচ (১, ৪ ও ৭ ডিসেম্বর) তাই র্যাঙ্কিং পয়েন্টের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। বিশেষ করে কেপ টাউনের মতো পেস-সহায়ক উইকেটে জয় ছিনিয়ে আনা হবে বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
অতীত পরিসংখ্যান ও চ্যালেঞ্জ
দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে বাংলাদেশের অতীত রেকর্ড খুব একটা সুখকর নয়। তবে ২০২২ সালের সফরে ঐতিহাসিক ওয়ানডে সিরিজ জয় দলের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছে। অতীতের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:
টেস্ট ক্রিকেট: আগের চার সফরে ৮টি টেস্টের প্রতিটিতেই হেরেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে ৫টি ছিল ইনিংস ব্যবধানে হার। প্রোটিয়াদের গতির মুখে বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপ অতীতে বারবার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে।
ওয়ানডে ক্রিকেট: ১২টি ম্যাচে মুখোমুখি হয়ে জয় এসেছে মাত্র ২টিতে (দুইটিই ২০২২ সালের সফরে)। বাকি ১০টি ম্যাচেই পরাজয় বরণ করতে হয়েছে।
টি-টুয়েন্টি: এই ফরম্যাটে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে এখন পর্যন্ত কোনো জয়ের দেখা পায়নি বাংলাদেশ। ৪টি ম্যাচের ৪টিতেই পরাজিত হয়েছে তারা।
প্রস্তুতি ও প্রত্যাশা
মেহেদী হাসান মিরাজের নেতৃত্বে বর্তমান বাংলাদেশ দলটি অনেক বেশি ভারসাম্যপূর্ণ। দলে যেমন অভিজ্ঞ ক্রিকেটার রয়েছেন, তেমনি প্রতিভাবান তরুণ পেসারদের আধিক্য দক্ষিণ আফ্রিকার বাউন্সি উইকেটে লড়াইয়ের রসদ জোগাবে। জোহানেসবার্গের বাউন্স আর সেঞ্চুরিয়নের গতি সামলানোই হবে ব্যাটারদের মূল কাজ। অন্যদিকে, শরিফুল ইসলাম বা নাহিদ রানার মতো গতির বোলাররা প্রোটিয়া শিবিরে ত্রাস সৃষ্টি করতে পারেন কি না, তা দেখার অপেক্ষায় ক্রিকেট বিশ্ব।
পরিশেষে, এই সফরটি কেবল জয়ের লড়াই নয়, বরং আধুনিক ক্রিকেটে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের সামর্থ্য প্রমাণের একটি নতুন মঞ্চ।
