ব্যাংকিং খাতের সংস্কারে বদ্ধপরিকর সরকার: গভর্নরের সাথে অর্থমন্ত্রীর বৈঠক

দেশের আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার আমূল সংস্কারে বর্তমান বিএনপি সরকার তাদের দৃঢ় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে। সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে সচিবালয়ে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সাথে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফলপ্রসূ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ব্যাংক খাতের চলমান সংস্কার প্রক্রিয়া, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং নবগঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

সংস্কার কার্যক্রমে সরকারের পূর্ণ সমর্থন

বৈঠক শেষে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, বিগত সময়ে ব্যাংকিং খাতে যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে বর্তমান সরকার নিরলসভাবে কাজ করছে। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন রক্ষা এবং গৃহীত সংস্কার কার্যক্রমগুলো অব্যাহত রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। অর্থমন্ত্রী আশ্বাস দেন যে, ব্যাংকিং খাতের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সকল নীতিগত সহায়তা প্রদান করা হবে।

গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বৈঠক প্রসঙ্গে বলেন, “আমরা গত কয়েক মাসে ব্যাংক খাতের সংস্কারে যে সকল পদক্ষেপ নিয়েছি, তার একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা মাননীয় মন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেছি। তিনি এসব কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে অত্যন্ত ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন।”

মূল্যস্ফীতি ও খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ

বৈঠকের অন্যতম প্রধান আলোচনার বিষয় ছিল লাগামহীন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। গভর্নর জানান, দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের নাগালে রাখা এবং মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। এর পাশাপাশি বড় খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ, ঋণ পুনর্গঠন নীতিমালা আধুনিকায়ন এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের চিহ্নিত করে ব্যাংকগুলোর শ্রেণিকরণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নিচে ব্যাংক খাতের সংস্কার ও বর্তমান পরিস্থিতির একটি সারসংক্ষেপ প্রদান করা হলো:

প্রধান আলোচনার বিষয়গৃহীত উদ্যোগ ও বর্তমান অবস্থা
ব্যাংকিং সংস্কারচলমান সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিতকরণ।
মূল্যস্ফীতিমুদ্রানীতির কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
খেলাপি ঋণইচ্ছাকৃত খেলাপিদের চিহ্নিতকরণ এবং কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক৫টি ব্যাংক একীভূত করে গঠিত ব্যাংকের স্থিতিশীলতা রক্ষা ও আমানত ফেরত নিশ্চিত করা।
নতুন এমডি নিয়োগসম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের এমডি নিয়োগের প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু করা হবে।

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক ও নতুন আমানত

দেশের আর্থিক খাতে বড় পরিবর্তনের অংশ হিসেবে এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংক—এই পাঁচটি ব্যাংক একীভূত হয়ে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠিত হয়েছে। ব্যাংকটির অনুমোদিত মূলধন ৪০ হাজার কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মধ্যে সরকার ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ সহায়তা প্রদান করেছে।

গভর্নর জানান, এই ব্যাংকটিকে স্থিতিশীল রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। ইতিপূর্বে একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের পুরোনো আমানতকারীরা ধাপে ধাপে তাদের পাওনা টাকা ফেরত পাচ্ছেন এবং আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো ব্যাংকটিতে নতুন আমানতও আসতে শুরু করেছে। তবে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। সুপারিশকৃত এমডি নাবিল মুস্তাফিজুর রহমান অসুস্থতার কারণে যোগ না দেওয়ায় নতুন করে যোগ্য ব্যক্তি খোঁজার প্রক্রিয়া শুরু হবে। নতুন এমডি নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান প্রশাসক ও পরিচালনা পর্ষদ ব্যাংকটির কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।

আগামীর পথচলা

ড. আহসান এইচ মনসুর আশা প্রকাশ করেন যে, সরকার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সমন্বিত প্রচেষ্টায় দেশের ব্যাংক খাত অচিরেই একটি মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে। ব্যাংকারদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়মিত আলোচনা হচ্ছে এবং গৃহীত পদক্ষেপগুলো এরই মধ্যে কাজ করতে শুরু করেছে বলে তিনি দাবি করেন। অর্থনীতিতে ঋণের প্রবাহ সচল রাখতে ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজনীয় তারল্য সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে।

পরিশেষে, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর সাথে এই বৈঠকটি দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে একটি ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি এবং আমানতকারীদের সুরক্ষা প্রদানই হবে আগামী দিনগুলোতে সরকারের মূল লক্ষ্য।