ইউরোপীয় ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে বর্ণবাদের কালো ছায়া আবারও এক অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। রিয়াল মাদ্রিদের ব্রাজিলীয় তারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে বর্ণবাদী গালি দেওয়ার অভিযোগে বেনফিকার তরুণ আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড জিয়ানলুকা প্রেসতিয়ান্নিকে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করেছে উয়েফা। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে বুধবার রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে ফিরতি লেগের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে মাঠে নামতে পারছেন না তিনি।
Table of Contents
ঘটনার সূত্রপাত ও উয়েফার কড়া পদক্ষেপ
গত সপ্তাহে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের প্রথম লেগের ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল রিয়াল মাদ্রিদ ও বেনফিকা। রিয়ালের জয়ের পর ভিনিসিয়ুস জুনিয়র সরাসরি অভিযোগ করেন যে, ম্যাচ চলাকালীন প্রেসতিয়ান্নি তাকে লক্ষ্য করে কুরুচিপূর্ণ বর্ণবাদী মন্তব্য করেছেন। অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনা করে উয়েফা দ্রুত তদন্ত শুরু করে। আজ এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে উয়েফা জানিয়েছে, ‘নৈতিকতা ও শৃঙ্খলা রক্ষা এবং তদন্তের স্বার্থে মিস্টার জিয়ানলুকা প্রেসতিয়ান্নিকে উয়েফা ক্লাব প্রতিযোগিতার পরবর্তী ম্যাচের জন্য সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করা হলো।’
নিচে এই ঘটনার প্রধান তথ্যসমূহ এবং সম্ভাব্য আইনি পরিণতি একটি ছকের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
| অভিযুক্ত খেলোয়াড় | জিয়ানলুকা প্রেসতিয়ান্নি (বেনফিকা) |
| অভিযোগকারী | ভিনিসিয়ুস জুনিয়র (রিয়াল মাদ্রিদ) |
| অভিযোগের ধরণ | বর্ণবাদী গালিগালাজ (বানর সম্বোধন) |
| প্রাথমিক শাস্তি | এক ম্যাচের সাময়িক নিষেধাজ্ঞা |
| সম্ভাব্য সর্বোচ্চ শাস্তি | অভিযোগ প্রমাণিত হলে ন্যূনতম ১০ ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা |
| তদন্তকারী সংস্থা | উয়েফা নৈতিকতা ও শৃঙ্খলা পরিদর্শক |
মাঠের উত্তপ্ত পরিস্থিতি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি
ম্যাচ চলাকালীন ভিনিসিয়ুস জয়সূচক একমাত্র গোলটি করার পর পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে ওঠে। এক পর্যায়ে বর্ণবাদী আচরণের অভিযোগে প্রায় ১০ মিনিট খেলা বন্ধ থাকে। অভিযোগ উঠেছে যে, প্রেসতিয়ান্নি নিজের জার্সি দিয়ে মুখ ঢেকে ভিনিসিয়ুসকে লক্ষ্য করে বিরূপ মন্তব্য করছিলেন যাতে টেলিভিশন ক্যামেরায় তার ঠোঁটের নড়াচড়া ধরা না পড়ে। রিয়াল মাদ্রিদের ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে এই ঘটনার প্রধান সাক্ষী হিসেবে দাবি করেছেন, প্রেসতিয়ান্নি অন্তত পাঁচবার ভিনিসিয়ুসকে ‘বানর’ বলে গালি দিয়েছেন। এমবাপ্পের এই সাক্ষ্য তদন্তে প্রেসতিয়ান্নির বিপক্ষে বড় প্রমাণ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
পাল্টা দাবি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝড়
নিষেধাজ্ঞা জারির পর অভিযুক্ত প্রেসতিয়ান্নি তার আত্মপক্ষ সমর্থনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ বার্তা দিয়েছেন। তিনি সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে লিখেছেন, “আমি পরিষ্কার করে বলতে চাই, আমি কোনো বর্ণবাদী মন্তব্য করিনি। ভিনিসিয়ুস ভুল শুনেছেন। উল্টো রিয়াল খেলোয়াড়দের কাছ থেকে আমি যে ধরণের হুমকি পেয়েছি, তা আমাকে মর্মাহত করেছে।”
অন্যদিকে, বেনফিকা ক্লাব তাদের খেলোয়াড়ের পাশে দাঁড়িয়ে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, তারা তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করবে। তবে একইসাথে তারা প্রশ্ন তুলেছে যে, তাদের খেলোয়াড় কোনো পরিকল্পিত ‘ষড়যন্ত্রের’ শিকার কি না। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র সরাসরি সংবাদ সম্মেলনে কথা না বললেও ইনস্টাগ্রামে লিখেছেন, “বর্ণবাদীরা আসলে কাপুরুষ। নিজেদের দুর্বলতা ঢাকতে তাদের জার্সি দিয়ে মুখ ঢাকতে হয়।”
বর্ণবাদ বিরোধী লড়াইয়ে রিয়াল মাদ্রিদ
রিয়াল মাদ্রিদ কর্তৃপক্ষ তাদের খেলোয়াড়ের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে উয়েফাকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেছে। বর্ণবাদের বিরুদ্ধে ভিনিসিয়ুসের দীর্ঘদিনের আপোষহীন লড়াই ফুটবল বিশ্বে সমাদৃত। ইতিপূর্বে স্প্যানিশ লা লিগাতেও তিনি একাধিকবার এমন পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন, যার ফলে দোষীদের জেল ও দীর্ঘমেয়াদী জেল খাটতে হয়েছে। উয়েফার বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, যদি প্রেসতিয়ান্নির অপরাধ প্রমাণিত হয়, তবে তিনি কেবল চ্যাম্পিয়ন্স লিগ নয়, বরং দীর্ঘ সময়ের জন্য ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকেও নিষিদ্ধ হতে পারেন। ফুটবল বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ফুটবলের মাঠ থেকে ঘৃণা ও বর্ণবাদ দূর করতে উয়েফার এই কঠোর অবস্থান অত্যন্ত জরুরি।
