ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ: আদালতের শরণাপন্ন রণবীর সিং

জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ‘কান্তারা ২’ এবং কর্ণাটকের ধর্মীয় ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট আইনি জটিলতায় ফেঁসে গেছেন বলিউড অভিনেতা রণবীর সিং। তার বিরুদ্ধে দায়ের করা এফআইআর (FIR) বা মামলা বাতিলের আবেদন নিয়ে তিনি এখন কর্ণাটক হাইকোর্টের দ্বারে উপস্থিত হয়েছেন। বেঙ্গালুরুতে হওয়া এই মামলাটি বর্তমানে ভারতের আইনি ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও অভিযোগের উৎস

ঘটনার সূত্রপাত হয় ২০২৫ সালের ২৮ নভেম্বর, গোয়ায় অনুষ্ঠিত ভারতের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের (IFFI) সমাপনী অনুষ্ঠানে। অভিযোগ রয়েছে, উক্ত অনুষ্ঠানে রণবীর সিং এমন একটি মঞ্চ পরিবেশনা দেন এবং মন্তব্য করেন যা উপকূলীয় কর্ণাটকের প্রাচীন ‘দৈব’ ঐতিহ্যকে অপমান করেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বেঙ্গালুরুভিত্তিক আইনজীবী প্রশান্ত মেথাল হাই গ্রাউন্ডস থানায় এই অভিযোগটি দায়ের করেন।

আইনজীবীর ভাষ্যমতে, রণবীর সিং মঞ্চে পরিবেশনার সময় উপকূলীয় কর্ণাটকের অত্যন্ত পবিত্র ‘পঞ্জুরলি’ এবং ‘গুলিগা’ দৈবের অভিব্যক্তি নকল করেছেন। সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় হলো, তিনি সেখানকার পরম পূজনীয় ‘চাভুন্ডি দৈব’কে বিদ্রুপের ছলে “মেয়ে ভূত” (Girl Ghost) বলে সম্বোধন করেন। উপকূলীয় কর্ণাটকের মানুষের কাছে চাভুন্ডি দৈব কোনো ভৌতিক সত্তা নয়, বরং তিনি দেবীশক্তির প্রতীক এবং ওই অঞ্চলের রক্ষাকর্তা হিসেবে পূজিত হন। তাকে ‘ভূত’ হিসেবে অভিহিত করা ভক্তদের গভীর ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনেছে বলে মামলার আরজিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলার আইনি ধারা ও বর্তমান অবস্থা

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে একটি ব্যক্তিগত অভিযোগ দায়ের করার পর, ২০২৬ সালের ২৩ জানুয়ারি আদালত পুলিশকে মামলা নথিবদ্ধ করার নির্দেশ দেয়। মামলাটি নবগঠিত ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-এর একাধিক ধারায় রুজু করা হয়েছে।

নিচে এই মামলার প্রধান আইনি দিকগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা দেওয়া হলো:

বিষয়বিস্তারিত তথ্য
অভিযুক্তরণবীর সিং (বলিউড অভিনেতা)
অভিযোগকারীপ্রশান্ত মেথাল (আইনজীবী, বেঙ্গালুরু)
ঘটনার স্থানগোয়া আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব (IFFI)
বিবাদমান মন্তব্যচাভুন্ডি দৈবকে ‘মেয়ে ভূত’ বলা
প্রযুক্ত আইনি ধারা (BNS)১৯৬, ২৯৯ এবং ৩০২ ধারা
পরবর্তী শুনানির দিন৮ এপ্রিল, ২০২৬
আদালতকর্ণাটক হাইকোর্ট (এফআইআর বাতিলের আবেদন)

‘কান্তারা ২’ এবং সাংস্কৃতিক স্পর্শকাতরতা

ঋষভ শেঠি পরিচালিত ‘কান্তারা’ সিনেমাটির বিশ্বজুড়ে আকাশচুম্বী সাফল্যের পর এর সিক্যুয়েল ‘কান্তারা ২’ নিয়ে দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক উন্মাদনা রয়েছে। এই চলচ্চিত্রটি মূলত উপকূলীয় কর্ণাটকের লোকজ সংস্কৃতি এবং ‘ভূত কোলা’ নামক ধর্মীয় আচারের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত। রণবীর সিংয়ের মতো একজন অভিনেতা যখন এই ঐতিহ্যের কোনো গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিয়ে মঞ্চে কৌতুক বা অভিনয় করেন, তখন তা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে বিকৃত উপস্থাপনা হিসেবে বিবেচিত হয়।

রণবীর সিংয়ের আইনজীবীরা হাইকোর্টে যুক্তি দেখিয়েছেন যে, অভিনেতার কোনো অসৎ উদ্দেশ্য ছিল না এবং তিনি স্রেফ সিনেমাটির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বা বিনোদনের খাতিরে এটি করেছিলেন। তবে আদালত মামলাটি বাতিল করবে কি না, তা নিয়ে এখন টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। বেঙ্গালুরুর প্রথম অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে বিষয়টি এখন উচ্চতর আদালতের পর্যালোচনার অপেক্ষায়।

উপসংহার

ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে স্পর্শকাতরতা ভারতে নতুন কোনো বিষয় নয়। শিল্পীর স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় অনুভূতির সুরক্ষা—এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করা প্রায়শই কঠিন হয়ে পড়ে। রণবীর সিংয়ের এই আইনি লড়াই কেবল তার ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের জন্যই নয়, বরং ভবিষ্যতে শিল্পীরা মঞ্চে কোনো অঞ্চলের সংস্কৃতি কীভাবে উপস্থাপন করবেন, তার জন্য একটি নজির হয়ে থাকবে। আগামী ৮ এপ্রিলের শুনানির ওপরই নির্ভর করছে এই অভিনেতার ভবিষ্যৎ আইনি পরিণতি।