বাংলাদেশের নবনিযুক্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান তার দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই এক তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বুধবার) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নিজের প্রথম কর্মদিবসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি জানান, তিনি ব্যক্তিগত কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা বা নিজের ইচ্ছায় এই গুরুভার গ্রহণ করেননি। দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তার এই বক্তব্য কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে।
Table of Contents
প্রেক্ষাপট ও নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতি
উল্লেখ্য যে, গত ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দুই-তৃতীয়াংশ আসনে নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে সরকার গঠন করেছে। নতুন এই মন্ত্রিসভায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানকে। পেশাদার কূটনীতিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক হিসেবে পরিচিত ড. খলিলুর রহমান সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলেও তার দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার কথা বিবেচনা করে টেকনোক্র্যাট কোটায় তাকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মহলে এবং পরাজিত দলগুলোর পক্ষ থেকে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা নির্বাচনী কারচুপির যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, সে বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে উত্তর দেন। তিনি বলেন, “যারা কারচুপির অভিযোগ তুলছেন, তারা চাইলে পুনরায় ভোট গণনা করে দেখতে পারেন। আমি তো নিজের ইচ্ছায় মন্ত্রী হইনি, আমাকে রাষ্ট্রের প্রয়োজনে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।”
ড. খলিলুর রহমানের নিয়োগ ও বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণ
ড. খলিলুর রহমান দেশের একজন প্রথিতযশা ব্যক্তিত্ব। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে তার বলিষ্ঠ ভূমিকা তাকে জাতীয় রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষায় তার ওপর আস্থা রেখেছে ক্ষমতাসীন দল। নিচে তার নিয়োগ ও বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা দেওয়া হলো:
| বিষয় | বিবরণ |
| নাম ও পদবী | ড. খলিলুর রহমান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী |
| নিয়োগের ধরণ | টেকনোক্র্যাট কোটা (অ-নির্বাচিত বিশেষজ্ঞ) |
| পূর্বতন অভিজ্ঞতা | সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা (অন্তর্বর্তী সরকার) |
| যোগদানের তারিখ | ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ |
| নির্বাচনী ফলাফল | বিএনপি’র দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা |
| প্রধান রাজনৈতিক ইস্যু | নির্বাচনী স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্ক |
নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চ্যালেঞ্জ ও রূপরেখা
দায়িত্ব গ্রহণের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ড. খলিলুর রহমান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি নিয়ে কথা বলেন। তিনি জানান, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করাই হবে তার প্রধান অগ্রাধিকার। বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির অস্থিরতায় নতুন নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান করার বিষয়ে তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
ড. খলিলুর রহমানের মতে, বর্তমান সরকার জনগণের রায় নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে এবং তারা আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে সম্মানজনক অংশীদারিত্বে বিশ্বাসী। নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে বিরোধীদের কোনো সংশয় থাকলে তা দূর করতে কূটনৈতিকভাবে কাজ করারও ইঙ্গিত দেন তিনি। তিনি বলেন, “আমরা কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার করব না, বরং আলোচনার মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান খুঁজব।”
বিশ্লেষকদের অভিমত
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ড. খলিলুর রহমানের মতো একজন পেশাদার ও অরাজনৈতিক ব্যক্তিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া বর্তমান সরকারের একটি কুশলী পদক্ষেপ। এতে একদিকে যেমন প্রশাসনে অভিজ্ঞতার ছাপ থাকবে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধিতেও তিনি সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারবেন। তবে নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে বিরোধীদের কঠোর অবস্থানের মুখে তিনি কীভাবে বৈশ্বিক সমর্থন আদায় করেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
পরিশেষে, ড. খলিলুর রহমান তার বক্তব্যে এ কথাটিই প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন যে, তিনি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ক্ষুদ্র স্বার্থে নয়, বরং রাষ্ট্রের বৃহত্তর প্রয়োজনে তার মেধা ও শ্রম ব্যয় করতে প্রস্তুত। তার এই ‘নিরাসক্ত’ অবস্থান জনমনে এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির আশার সঞ্চার করেছে।
