মার্কিন আদালতের রায়ে ট্রাম্পের শুল্ক অবৈধ: নতুন ঘোষণা

বিশ্ব বাণিজ্য ও ভূ-রাজনীতিতে এক নাটকীয় মোড় নিয়ে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিতর্কিত ‘পাল্টা শুল্ক’ নীতিকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন। গতকাল শুক্রবার দেশটির সর্বোচ্চ আদালত এক ঐতিহাসিক রায়ে জানিয়েছেন, ট্রাম্প ইন্টারন্যাশনাল ইমারজেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট (IEEPA) ব্যবহার করে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ওপর যে শুল্ক আরোপ করেছিলেন, তা প্রেসিডেন্টের আইনি ক্ষমতার বহির্ভূত। এই রায়ের ফলে বিশ্বজুড়ে স্বস্তি দেখা দিলেও ট্রাম্পের পাল্টা ঘোষণায় নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।

আদালতের রায় ও আইনি প্রেক্ষাপট

মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের ৯ জন বিচারপতির মধ্যে ৬ জনই ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের বিপক্ষে রায় দেন। আদালত পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, প্রেসিডেন্ট যে জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন প্রয়োগ করে শুল্ক আরোপ করেছিলেন, সেই আইনটি তাঁকে এককভাবে বাণিজ্যিক শুল্ক নির্ধারণের ক্ষমতা দেয় না। গত বছরের ২ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া এই শুল্ক ব্যবস্থাকে আদালত অসাংবিধানিক ও বেআইনি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া ও নতুন ১০% শুল্কের ঘোষণা

আদালতের এই রায়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই রায়কে ‘জাতির জন্য অসম্মানজনক’ বলে অভিহিত করেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, বিচারপতিরা মার্কিনিদের বদলে বিদেশিদের স্বার্থ রক্ষা করেছেন। রায়ের প্রতিক্রিয়ায় তিনি অবিলম্বে নতুন পদক্ষেপের ঘোষণা দেন। ট্রাম্প জানিয়েছেন, ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইন এবং ১৯৬২ সালের বাণিজ্য সম্প্রসারণ আইন ব্যবহার করে তিনি সকল আমদানিকৃত পণ্যের ওপর নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবেন।

বাংলাদেশের বাণিজ্যে প্রভাব ও শুল্ক বিবর্তন

বাংলাদেশের জন্য এই খবরটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর প্রাথমিক শুল্কহার অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। দীর্ঘ দেনদরবার ও বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে এটি ধীরে ধীরে সহনীয় পর্যায়ে আসছিল। নিচে বাংলাদেশের ওপর আরোপিত শুল্কের পরিবর্তনের একটি রূপরেখা দেওয়া হলো:

সময়কালশুল্কের ধরণ/অবস্থাকার্যকর শুল্কহার (ভিত্তি ১৫% সহ)
গত বছর (এপ্রিল)ট্রাম্পের প্রাথমিক পাল্টা শুল্ক (৩৭%)৫২%
গত বছর (জুলাই)আলোচনার পর হ্রাসকৃত শুল্ক (৩৫%)৫০%
গত বছর (আগস্ট)সমঝোতা পরবর্তী হ্রাস (২০%)৩৫%
চলতি মাস (ফেব্রুয়ারি ২০২৬)বাণিজ্য চুক্তির পর শুল্ক (১৯%)৩৪%
বর্তমান (আদালতের রায়ের পর)পাল্টা শুল্ক অবৈধ, নতুন ১০% প্রস্তাবিতঅপেক্ষমাণ (সম্ভবত ২৫-২৬%)

বিশ্ব বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক পূর্বাভাস

আদালতের এই রায়ের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য আমদানির গড় শুল্ক হার ১৬.৮ শতাংশ থেকে কমে ৯.৫ শতাংশে নামার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে ট্রাম্পের জেদ এবং নতুন আইনের মাধ্যমে শুল্ক আরোপের ঘোষণা এই স্বস্তিকে দীর্ঘস্থায়ী হতে দিচ্ছে না। মার্কিন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইওয়াই-পার্থেননের প্রধান অর্থনীতিবিদ গ্রেগরি ডাকো মনে করেন, শুল্ক হার কমাটা সাময়িক হতে পারে, কারণ ট্রাম্প প্রশাসন বিকল্প আইনি পথে আরও কঠোর শুল্ক আরোপের চেষ্টা চালাবে।

উল্লেখ্য যে, ট্রাম্পের হুমকির মুখে বাংলাদেশসহ অনেক দেশই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিশেষ বাণিজ্য চুক্তি করেছে, যার অধীনে যুক্তরাষ্ট্র থেকে নানা পণ্য আমদানির বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, ভারতের মতো দেশগুলোর সঙ্গে হওয়া এই চুক্তিগুলো বহাল থাকবে। তবে নতুন ১০ শতাংশ শুল্ক কীভাবে কার্যকর হবে এবং এর ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন কীভাবে প্রভাবিত হবে, তা নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে বিশদ বিশ্লেষণ চলছে।