আন্তর্জাতিক ফুটবল মঞ্চে নান্দাইলের তিন অদম্য কন্যারা

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের ইতিহাসে এক নতুন ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার তিন হতদরিদ্র পরিবারের কন্যা এখন দেশের সীমা ছাড়িয়ে বিশ্বমঞ্চে লাল-সবুজের প্রতিনিধি। এশীয় নারী ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর ‘এশিয়ান কাপ’ খেলতে বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন নান্দাইলের তিন কৃতি ফুটবলার। গত বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) রাত ১১টা ৫০ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তারা বিমানযোগে অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।

এশিয়ান কাপের প্রেক্ষাপট ও প্রতিপক্ষ

আগামী ১ মার্চ থেকে ২১ মার্চ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার তিনটি শহরে এই টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হবে। কোচ পিটার বাটলারের অধীনে ২৬ সদস্যের এই দলটি প্রথমবারের মতো এশিয়ার সর্বোচ্চ পর্যায়ের কোনো টুর্নামেন্টে অংশ নিতে যাচ্ছে। যদিও অভিজ্ঞতা ও ঐতিহ্যের বিচারে প্রতিপক্ষ দলগুলো যোজন যোজন এগিয়ে, তবুও আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান বাংলাদেশের ফুটবল কন্যারা। আগামী ৩ মার্চ ৯ বারের চ্যাম্পিয়ন চীনের বিপক্ষে লড়াই দিয়ে শুরু হবে বাংলাদেশের যাত্রা।

নিচে বাংলাদেশের প্রাথমিক সূচি ও প্রতিপক্ষের শক্তি সম্পর্কে একটি তুলনামূলক সারণি প্রদান করা হলো:

তারিখপ্রতিপক্ষ দলপ্রতিপক্ষের শক্তিমত্তা ও ঐতিহ্য
৩ মার্চচীনএশিয়ান কাপের ৯ বারের শিরোপাজয়ী দল।
৬ মার্চউত্তর কোরিয়াতিনবারের এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন ও শক্তিশালী দল।
৯ মার্চউজবেকিস্তানপাঁচবার এশিয়ান কাপ খেলা অভিজ্ঞ দল।

নান্দাইলের তিন রত্ন: দারিদ্র্য জয়ী ফুটবলার

নান্দাইল উপজেলার তিনটি ভিন্ন ইউনিয়ন থেকে উঠে আসা এই তিন কন্যার জীবনগল্প যেমন কষ্টের, তেমনি অনুপ্রেরণার। তাদের সংগ্রামী জীবনের সংক্ষিপ্ত পরিচয় নিচে তুলে ধরা হলো:

১. মিলি আক্তার (গোলরক্ষক):

চন্ডীপাশা ইউনিয়নের বারুইগ্রামের কলা বিক্রেতা মো. সামছুল হকের মেয়ে মিলি আক্তার। চরম অভাবের মাঝে বড় হওয়া মিলি এখন জাতীয় দলের অন্যতম নির্ভরতা। ২০২২ সালের সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের পর তিনি আলোচনায় আসেন এবং পরে পারফরম্যান্সের জোরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে চাকরির সুযোগ পান। বর্তমানে তিনি জাতীয় দলের দ্বিতীয় গোলরক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

২. সৌরভী আকন্দ প্রীতি (মিডফিল্ডার):

জাহাঙ্গীরপুর ইউনিয়নের বারঘরিয়া গ্রামের এক দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান প্রীতি। ২০১৮ সালে বঙ্গমাতা গোল্ডকাপের মাধ্যমে তাঁর উত্থান শুরু। এরপর অনূর্ধ্ব-১৫, ১৭ ও ১৯ দলে নিয়মিত খেলেছেন। অনূর্ধ্ব-১৫ সাফে হ্যাটট্রিক করে সাড়া ফেলে দেওয়া প্রীতি এখন জাতীয় দলের মধ্যমাঠের প্রধান ভরসা।

৩. হালিমা আক্তার (স্ট্রাইকার):

শেরপুর ইউনিয়নের রাজাবাড়িয়া গ্রামের দুলাল মিয়ার মেয়ে হালিমা। অনূর্ধ্ব-১৯ চ্যাম্পিয়ন দলের সদস্য হওয়ার পাশাপাশি তিনি ইতিপূর্বে ভুটান, জর্ডান ও দুবাইয়ের মাঠে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন। নান্দাইলের এই আক্রমণভাগের তারকা এবার অস্ট্রেলিয়ার মাঠে গোল করতে মরিয়া।

সাফল্যের সম্ভাবনা ও প্রত্যাশা

বাংলাদেশের এই নারী ফুটবলাররা প্রমাণ করেছেন যে, প্রবল ইচ্ছা এবং শ্রম থাকলে দারিদ্র্য কোনো বাধা হতে পারে না। বাছাই পর্বে এই তিনজনের অনবদ্য ভূমিকা বাংলাদেশকে মূল পর্বে উত্তীর্ণ হতে সহায়তা করেছে। কোচ পিটার বাটলার মনে করেন, চীন বা উত্তর কোরিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে খেলা আমাদের মেয়েদের জন্য বিশাল অভিজ্ঞতার সুযোগ। নান্দাইলের এই তিন কন্যা আজ কেবল ময়মনসিংহের নয়, বরং গোটা বাংলাদেশের গর্ব। তাদের এই যাত্রা দেশের তৃণমূল পর্যায়ের হাজারো কিশোরীকে ফুটবল খেলার প্রতি উৎসাহিত করবে।