ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ওয়েবসাইটে প্রকাশিত মশক নিধন কর্মপরিকল্পনা তালিকায় এমন চমকপ্রদ বিষয় উঠে এসেছে যে, সেই তালিকায় একজন মৃত ব্যক্তির নামও রয়েছে। বিশেষ করে মিরপুরের ২ নম্বর ওয়ার্ডের কর্মীদের তালিকায় ৮ নম্বর নাম হিসাবে উপস্থিত অফর আলী, যিনি প্রায় আড়াই বছর আগে মৃত্যুবরণ করেছেন, এখনো নিয়মিত কর্মী হিসেবে দেখানো হচ্ছে।
তালিকায় কর্মীদের সপ্তাহের কার্যক্রম নির্ধারিত আছে। অফর আলীর ক্ষেত্রে, সোমবার ও বৃহস্পতিবার সকাল ৮.৩০ থেকে ১১.৩০ পর্যন্ত সাগুফতা আবাসিক এলাকার ১–৫ নম্বর সড়ক এবং বেগুনটিলা বস্তি এলাকায় কাজ করার কথা উল্লেখ আছে। তবে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, নির্ধারিত সময়েও তিনি উপস্থিত ছিলেন না।
প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাগুফতা থেকে সামান্য দূরে স্বপ্ননগর আবাসিক এলাকায় মশা নিধনের কাজে নিয়োজিত এক কর্মীকে দেখা গেছে, তবে তিনি তখন কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন না। মোটরসাইকেলে করে চলার সময় পরিচয় দিয়ে জানানো হলে জানা যায়, মোটরসাইকেল চালক রকিবুল আলম খান, ২ নম্বর ওয়ার্ডের সুপারভাইজার, আর সঙ্গে থাকা কর্মীর নাম শাহ আলম। সুপারভাইজার রকিবুল জানিয়েছেন, তালিকায় থাকা অফিসার আলী প্রায় আড়াই বছর আগে মারা গেছেন।
ডিএনসিসির স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী বলেন, “ওয়েবসাইটের তথ্য অনেকদিন হালনাগাদ করা হয়নি। তালিকায় অনেক অসংগতি রয়েছে। মশক নিধনের কার্যক্রম শুধু ওষুধ ছিটানো নয়, বরং কার্যকর ড্রেনেজ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সমন্বিত হতে হবে।”
মশা নিধনের কর্মসূচি মূলত দুই ভাগে বিভক্ত:
| সময়সূচি | কার্যক্রম | লক্ষ্য এলাকা |
|---|---|---|
| সকাল ৮.৩০–১১.৩০ | লার্ভিসাইডিং (জমে থাকা পানিতে ওষুধ ছিটানো) | আবাসিক এলাকা ও বস্তি |
| বিকেল ৩.৩০–৫.৩০ | ফগিং (উড়ন্ত মশা মারার ধোঁয়া ছিটানো) | রাস্তা, খাল, খোলা জায়গা |
স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, মশার উপদ্রব বেড়েছে। স্বপ্ননগরের বাসিন্দা আরাফাত হোসেন বলেন, “রাতে বারান্দায় বসাই যায় না, কয়েল বা স্প্রের কাজ হচ্ছে না।” সাগুফতার জাহিদ হাসান বলেন, “বিকেলের পর মশার ঝাঁক আসে, মাগরিবের পর দরজা-জানালা বন্ধ রাখতে হয়।”
মোহাম্মদপুরের কাদেরাবাদ আবাসিক এলাকার বাসিন্দা জাকির সরকার ও উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টর কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, সিটি করপোরেশনের কর্মীরা প্রায়শই শুধু ছবি তোলার জন্য ওষুধ নিয়ে যান, প্রকৃত কার্যক্রম হয় অর্ধেক মাত্র।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, মশা নিধনের কার্যকর সমাধান ছাড়া শুধু ওষুধ ছিটানো পর্যাপ্ত নয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, “নালা-নর্দমা ও ডোবাগুলো দ্রুত পরিষ্কার করা, লার্ভিসাইডিং কার্যক্রম জরুরি। স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়হীনতা ও তদারকির অভাবে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।”
ডিএনসিসি স্বাস্থ্য বিভাগ ইতোমধ্যে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগকে সম্পৃক্ত করে সমন্বিত মশা নিধন কর্মসূচি শুরু করেছে। তবে কার্যক্রমের সঠিক তদারকি ও নিয়মিত হালনাগাদ তথ্য ছাড়া সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে না।
মোটকথা, ঢাকা উত্তরের মশা নিধন কার্যক্রমে শুধু মৃত ব্যক্তির নামের তালিকায় থাকা নয়, বরং বাস্তব কর্মকাণ্ডেও উল্লেখযোগ্য অসংগতি দেখা দিয়েছে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
