দক্ষিণ কোরিয়ার বিচারিক ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী রায় ঘোষণা করা হয়েছে। ২০২৪ সালে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার উদ্দেশ্যে অবৈধভাবে সামরিক আইন জারির প্রচেষ্টাকে ‘বিদ্রোহ’ হিসেবে গণ্য করে দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট ইউন সুক-ইওলকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেছেন আদালত। বৃহস্পতিবার সিউল সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট এই রায় ঘোষণা করেন, যা কেবল কোরিয়ায় নয়, বরং পুরো এশিয়ায় গণতন্ত্রের সুরক্ষায় একটি শক্তিশালী বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও ‘বিদ্রোহ’ ঘোষণা
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এক নাটকীয় ও আকস্মিক টেলিভিশন ভাষণে প্রেসিডেন্ট ইউন সুক-ইওল দেশে সামরিক আইন জারির ঘোষণা দেন। তিনি তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সমালোচকদের ‘রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি’ হিসেবে অভিহিত করে তাদের নির্মূল করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন। তার নির্দেশে সামরিক বাহিনী ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি বা পার্লামেন্ট ভবন ঘেরাও করে এবং গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের গ্রেপ্তারের প্রচেষ্টা চালায়। তবে দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ, বিরোধী দল এবং এমনকি তার নিজ দলের একাংশের তীব্র বিরোধিতার মুখে সেই সামরিক শাসন মাত্র ছয় ঘণ্টা স্থায়ী হয়েছিল।
আদালতের পর্যবেক্ষণ ও রায়
বিচারক জি গুই-ইয়ন রায়ে উল্লেখ করেন যে, ইউন সুক-ইওল মূলত পার্লামেন্টে তার বিপুলসংখ্যক সমালোচককে রাজনৈতিকভাবে অকেজো করে দেওয়ার হীন উদ্দেশ্যে এই পরিকল্পনা করেছিলেন। আদালত কঠোর ভাষায় বলেন, এই অবৈধ ঘোষণার ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার সমাজকে বিশাল রাজনৈতিক ও মানসিক মূল্য চুকাতে হয়েছে। বিচারক আরও যোগ করেন যে, বিবাদী বা সাবেক প্রেসিডেন্টের মধ্যে এই নজিরবিহীন ঘটনার জন্য কোনো প্রকার অনুশোচনা বা অনুতাপের লক্ষণ লক্ষ্য করা যায়নি।
ইউন সুক-ইওলের বিচার প্রক্রিয়ার মূল দিকসমূহ:
| বিষয় | বিবরণ |
| প্রধান অভিযোগ | বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেওয়া এবং সাংবিধানিক ধারা লঙ্ঘন। |
| আদালত | সিউল সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট। |
| কৌঁসুলিদের দাবি | সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের আবেদন। |
| চূড়ান্ত রায় | যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। |
| রাজনৈতিক পরিস্থিতি | পার্লামেন্টে বাজেট বরাদ্দ ও অভিশংসন নিয়ে বিরোধ। |
দণ্ডবিধির প্রয়োগ ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব
মামলার শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা ইউনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অভিযোগে সর্বোচ্চ শাস্তি অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আবেদন জানিয়েছিলেন। তবে আদালত মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সিদ্ধান্ত নেন। উল্লেখ্য যে, দক্ষিণ কোরিয়ায় বর্তমানে অনানুষ্ঠানিকভাবে মৃত্যুদণ্ড স্থগিত রয়েছে; দেশটিতে সর্বশেষ ১৯৯৭ সালে এই দণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইউন সুক-ইওল তার মেয়াদের শেষের দিকে অত্যন্ত অজনপ্রিয় হয়ে পড়েছিলেন। পার্লামেন্টে তার দল কোণঠাসা হয়ে পড়ায় তিনি প্রশাসনিকভাবে কার্যত অচল হয়ে পড়েন। বিরোধীরা তাকে ‘অকার্যকর’ করে দিচ্ছে—এমন একটি কাল্পনিক ভীতির বশবর্তী হয়েই তিনি সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সহায়তায় গণতন্ত্রকে স্তব্ধ করতে চেয়েছিলেন। আজকের এই রায় প্রমাণ করল যে, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয় এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোকে ধ্বংস করার যে কোনো চেষ্টা কঠোর শাস্তির যোগ্য।
এই রায় ঘোষণার পর সিউলের রাজপথে সাধারণ মানুষকে আনন্দ উল্লাস করতে দেখা গেছে। দেশটির বর্তমান প্রশাসন জানিয়েছে, বিচার বিভাগের এই স্বাধীন অবস্থান দক্ষিণ কোরিয়ার গণতান্ত্রিক ভিতকে আরও মজবুত করবে।
