পঙ্কজ কুমার মল্লিক (১০ মে ১৯০৫ – ১৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৮) বাংলা ও হিন্দি সঙ্গীত জগতের এক অমর নাম। তিনি ছিলেন কণ্ঠশিল্পী, সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক ও চলচ্চিত্র অভিনেতা। ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রথম যুগে নেপথ্য কণ্ঠসংগীত (playback singing) প্রবর্তন এবং রবীন্দ্রসঙ্গীতকে জনপ্রিয় ধারায় প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনন্য।
Table of Contents
জন্ম ও শিক্ষাজীবন
কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিবেশে ১৯০৫ সালের ১০ মে জন্মগ্রহণ করেন পঙ্কজ কুমার। পিতা মণিমোহন মল্লিক ও মাতা মনোমোহিনী দেবীর উৎসাহ তাকে ছোটবেলা থেকেই সঙ্গীতচর্চার প্রতি অনুরাগী করে তোলে। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের শিক্ষার জন্য তিনি প্রখ্যাত গুরু দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে তালিম নেন। পরে স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন।
রবীন্দ্রসঙ্গীতে অগ্রণী ভূমিকা
পঙ্কজ কুমারের জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আসে যখন তিনি দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে পরিচিত হন। রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্যে এসে তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রতি গভীর অনুরাগী হন এবং অল্প সময়ে এর অন্যতম প্রধান শিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
১৯৩২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তাঁর প্রথম রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড প্রকাশিত হয়—
“প্রলয়নাচন নাচলে যখন, ও তোমার আসন শূন্য আজি”।
রেকর্ড ও বেতার জীবন
১৮ বছর বয়সে ১৯২৬ সালে তিনি “নেমেছে আজ প্রথম বাদল” গানটি রেকর্ড করেন।
১৯২৭ সালে কলকাতার ইন্ডিয়ান ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন-এ (বর্তমানে আকাশবাণী কলকাতা) যোগ দেন। প্রায় পাঁচ দশক ধরে তিনি সেখানকার প্রধান সঙ্গীত পরিচালক ও শিল্পী ছিলেন। বেতারে তাঁর সুরায়োজিত “মহিষাসুরমর্দিনী” অনুষ্ঠান আজও বাঙালির মহালয়ার ভোরের আবেগের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত।
চলচ্চিত্রে অবদান
১৯৩১ থেকে ১৯৬৯ পর্যন্ত তিনি বাংলা, হিন্দি, উর্দু ও তামিল চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালক ও শিল্পী হিসেবে কাজ করেন। ভারতের প্রাচীনতম চলচ্চিত্র সংস্থা নিউ থিয়েটার্স-এর সঙ্গে প্রায় ২৫ বছর যুক্ত ছিলেন। নেপথ্য কণ্ঠসংগীতের ক্ষেত্রে তিনি রাইচাঁদ বড়াল ও নীতীন বসুর সঙ্গে পথিকৃৎ ভূমিকা পালন করেন।
তাঁর সঙ্গীত যাত্রার প্রধান অবদানসমূহ:
| বছর | ক্ষেত্র | উল্লেখযোগ্য অবদান |
|---|---|---|
| ১৯২৬ | রেকর্ড | “নেমেছে আজ প্রথম বাদল” গান রেকর্ড |
| ১৯২৭–১৯৭০ | বেতার | আকাশবাণীতে সঙ্গীত পরিচালক ও শিল্পী; “মহিষাসুরমর্দিনী” প্রচার |
| ১৯৩১–১৯৬৯ | চলচ্চিত্র | বাংলা, হিন্দি, উর্দু, তামিল চলচ্চিত্রে সঙ্গীত ও নেপথ্য কণ্ঠসংগীত |
| ২০০৬ | স্মরণ | জন্মশতবার্ষিকীতে ভারতীয় ডাক বিভাগের স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ |
তিনি কুন্দন লাল সায়গল, শচীন দেব বর্মণ, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, গীতা দত্ত, আশা ভোঁসলের সঙ্গে কাজ করেছেন। অভিনেতা হিসেবেও তিনি প্রমথেশ বড়ুয়া ও কানন দেবীর সঙ্গে পর্দায় হাজির হয়েছেন।
উত্তরাধিকার ও স্মরণ
১৯৭৮ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি পরলোকগমন করেন পঙ্কজ কুমার। কিন্তু তাঁর সুর, কণ্ঠ ও সৃষ্টির ধারা আজও বাংলা ও ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে অমলিন। তিনি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, রবীন্দ্রসঙ্গীত ও চলচ্চিত্র সঙ্গীতকে একসূত্রে গেঁথেছিলেন। তাঁর কণ্ঠের মাধুর্য, আবেগ ও ভক্তি আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে বাজে।
পঙ্কজ কুমার মল্লিকের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, যিনি সত্যিই বাংলা সঙ্গীত জগতের এক অনন্য সেতুবন্ধন ছিলেন।
