সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় সাত বছর বয়সী শিশু ও স্কুলছাত্র তামীম হোসেনকে নৃশংসভাবে হত্যার দায়ে তিন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেছেন আদালত। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ নয় বছর আগের এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) এই রায় ঘোষণা করা হয়। আদালতের রায়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপক্ষ ও নিহতের পরিবার।
Table of Contents
রায়ের বিস্তারিত ও দণ্ডপ্রাপ্তদের তথ্য
সিরাজগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. ইকবাল হোসেন জনাকীর্ণ আদালতে এই রায় প্রদান করেন। রায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি দণ্ডিত প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অনাদায়ে তাঁদের আরও নির্দিষ্ট মেয়াদে সাজা ভোগ করতে হবে। এছাড়া মামলার চতুর্থ আসামি মান্নান আকন্দকে অপরাধের সংশ্লিষ্টতা অনুযায়ী দুই বছরের কারাদণ্ড এবং পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট শাকিল মো. শরিফুল হায়দার (রফিক সরকার) মামলার বিবরণ দিয়ে জানান যে, আধিপত্য বিস্তার ও স্থানীয় বিরোধের জের ধরে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছিল।
মামলার সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ ও ঘটনাপঞ্জি
নিচে তামীম হোসেন হত্যা মামলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাদি একটি টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| বিষয় | বিবরণ |
| ভিকটিম | তামীম হোসেন (বয়স: ৭ বছর) |
| হত্যাকাণ্ডের স্থান | নরসিংহপাড়া গ্রাম, উল্লাপাড়া, সিরাজগঞ্জ |
| ঘটনার তারিখ | ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ |
| নিখোঁজের সময় | নানার বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয় |
| মরদেহ উদ্ধার | ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ (সরিষার ক্ষেত থেকে) |
| মামলার বাদী | সোলেমান ফকির (নিহতের বাবা) |
| হত্যার মোটিভ | স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধ |
| রায়ের তারিখ | ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ |
হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কাহিনী
নিহত তামীম হোসেন উল্লাপাড়া উপজেলার নরসিংহপাড়া গ্রামে তার নানার বাড়িতে থেকে স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করত। ২০১৭ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তামীম হঠাৎ নানার বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়। পরিবারের সদস্যরা ওইদিন সম্ভাব্য সব স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান পাননি। পরের দিন ১১ ফেব্রুয়ারি সকালে গ্রামবাসীরা পার্শ্ববর্তী বাবুল আকতারের সরিষার ক্ষেতে একটি শিশুর মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন।
খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা সেখানে গিয়ে তামীমের মরদেহ শনাক্ত করেন। মরদেহের গলায় রশি পেঁচানো ছিল এবং মাথার পেছনে ধারালো কোনো বস্তু বা ভারি কিছুর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। এ ঘটনায় নিহতের বাবা সোলেমান ফকির অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে উল্লাপাড়া মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
তদন্ত ও অপরাধীদের স্বীকারোক্তি
মামলা দায়েরের পর পুলিশ তদন্তে নামে এবং সন্দেহভাজন তিনজনকে গ্রেফতার করে। পুলিশের নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা অপরাধ স্বীকার করে এবং আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি প্রদান করে। স্বীকারোক্তিতে তারা জানায় যে, তামীমের পরিবারের ওপর রাজনৈতিক বা স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে প্রতিশোধ নিতেই অবুঝ এই শিশুটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল।
মামলার তদন্ত শেষে পুলিশ চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। দীর্ঘ শুনানি এবং সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে আদালত আজ এই চূড়ান্ত রায় প্রদান করলেন। এই রায়ের মাধ্যমে প্রমাণিত হলো যে, নিরপরাধ প্রাণের ওপর নৃশংসতার কোনো মাফ নেই। এলাকার সচেতন নাগরিকরা আশা করছেন, এই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ভবিষ্যতে এলাকায় এ ধরনের জঘন্য অপরাধ রোধে সহায়ক হবে।
