জার্মানির মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলন (MSC) দীর্ঘকাল ধরে পাশ্চাত্য বিশ্বের সংহতি প্রদর্শনের অন্যতম প্রধান মঞ্চ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তবে সাম্প্রতিক সম্মেলনটি অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে ভিন্ন এক বার্তা বহন করছে। এই সম্মেলনে যোগ দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাট নেতা এবং ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকদের আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গৃহীত নীতিগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যকার দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্কে যে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে, তা নিরাময় করা হয়তো আর সম্ভব নয়।
Table of Contents
‘মুক্ত বিশ্বের নেতা’ উপাধির সংকট
এক সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে অবধারিতভাবে ‘মুক্ত বিশ্বের নেতা’ হিসেবে গণ্য করা হতো। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসমের মতো উদীয়মান ডেমোক্র্যাট নেতারাও স্বীকার করছেন যে, এই উপাধি এখন অনেকটাই প্রশ্নবিদ্ধ। আটলান্টিক পারের দেশগুলোর জোটের ওপর থেকে ইউরোপের আস্থা যেভাবে ধসে পড়েছে, তাতে হোয়াইট হাউসের পরবর্তী উত্তরসূরি যেই হোন না কেন, সেই হারানো বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা হবে এক হিমালয়সম চ্যালেঞ্জ।
ইউরোপের নতুন বাস্তবতা ও ‘যুক্তরাষ্ট্র পরবর্তী’ শতাব্দী
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস মিউনিখ সম্মেলনে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা ইউরোপের নীতিনির্ধারণী মহলে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তিনি স্পষ্ট করেই বলেছেন, বিশ্ব এখন একটি ‘যুক্তরাষ্ট্র পরবর্তী’ (Post-American) শতাব্দীতে প্রবেশ করেছে। ইউরোপের পারমাণবিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে ফ্রান্সের সঙ্গে জার্মানির নিবিড় আলোচনা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভরতা কমানোরই নামান্তর।
নিচে মিউনিখ সম্মেলনের আলোকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্পর্কের পরিবর্তনের মূল দিকগুলো একটি সারণির মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| বিষয়ের ক্ষেত্র | অতীতের অবস্থান (ম্যাককেইন যুগ) | বর্তমান বাস্তবতা (ট্রাম্প যুগ) |
| পারস্পরিক আস্থা | যুক্তরাষ্ট্র মিত্রদের পাশে দাঁড়াবে—এটি ছিল ধ্রুব সত্য। | যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকারের ওপর ইউরোপের আর বিশ্বাস নেই। |
| নিরাপত্তা জোট | ন্যাটো (NATO) ছিল নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। | ইউরোপ এখন নিজস্ব ও স্বাধীন নিরাপত্তা ব্যবস্থার পথ খুঁজছে। |
| আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা | নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা শক্তিশালী ছিল। | নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা আজ ধ্বংসের মুখে। |
| মার্কিন আধিপত্য | যুক্তরাষ্ট্র ছিল বিশ্বের একক ও প্রশ্নাতীত নেতা। | বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের কণ্ঠস্বর ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। |
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক প্রভাব
রিপাবলিকান স্পিকার মাইক জনসন কংগ্রেসের প্রতিনিধিদলের সফর বাতিল করলেও জেসন ক্রোর মতো ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধিরা নিজ উদ্যোগে সম্মেলনে যোগ দিয়ে মিত্রদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছেন। জেসন ক্রো সতর্ক করে বলেছেন যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে শান্তি দিলেও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। এই শূন্যতাকেই কাজে লাগিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
অন্যদিকে, লিন্ডসে গ্রাহামের মতো ট্রাম্প ঘনিষ্ঠ রিপাবলিকানরা যখন ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের দাবি তোলেন, তখন ইউরোপীয় মিত্ররা আরও বেশি আতঙ্কিত বোধ করেন। তাদের মতে, ট্রাম্পের কর্মকাণ্ড কেবল আটলান্টিক জোটকেই দুর্বল করেনি, বরং রাশিয়া ও চীনের মতো শক্তির মোকাবিলায় পাশ্চাত্যকে বিভক্ত করে ফেলেছে।
ডেমোক্র্যাটদের প্রত্যাশা ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
গ্যাভিন নিউসম আশাবাদী যে, ট্রাম্পের বিতর্কিত নীতিগুলোর কারণে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা বড় জয় পাবে এবং ট্রাম্পের ক্ষমতা সংকুচিত হবে। তবে ইউরোপীয় নেতাদের আশঙ্কা আরও গভীরে। তারা মনে করছেন, ২০১৬ সালে ট্রাম্পের জয় কোনো ‘ব্যতিক্রম’ ছিল না, বরং এটি মার্কিন জনমতের একটি স্থায়ী পরিবর্তনের প্রতিফলন। ফলে ভবিষ্যতে অন্য কেউ ক্ষমতায় এলেও যুক্তরাষ্ট্র যে আবার আগের মতো বিশ্বস্ত মিত্র হিসেবে ফিরে আসবে, সেই নিশ্চয়তা এখন আর কেউ দিতে পারছে না।
সার্বিকভাবে, ট্রাম্পের করা ক্ষতি সামলাতে ইউরোপ এখন আত্মনির্ভরশীলতার পথ খুঁজছে, আর ডেমোক্র্যাটরা লড়ছেন হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারের এক অনিশ্চিত যুদ্ধে।
