বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আজ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি চলছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই নির্বাচনকে ঘিরে যখন দেশজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে, ঠিক তখনই জনমনে নতুন এক উদ্বেগের বিষয়ে সতর্ক করেছেন বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন। বুধবার বিকেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি ইসলামী পোশাক বোরকা ও নেকাবের অপব্যবহার করে ভোট জালিয়াতির আশঙ্কা প্রকাশ করেন এবং এই অপতৎপরতা রুখতে ভোটার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিশেষ সতর্কবার্তা প্রদান করেন।
Table of Contents
বোরকা-নেকাবের আড়ালে জালিয়াতির শঙ্কা
মাহদী আমিন তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সম্প্রতি প্রচুর পরিমাণে বোরকা ও নেকাব তৈরির তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, যা স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। তিনি বলেন, “বিএনপি ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর শ্রদ্ধাশীল একটি দল এবং আমরা নারীদের পর্দা ও শালীনতার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ সম্মান করি। কিন্তু ধর্মীয় পবিত্র পোশাককে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে যদি কেউ ‘ভুয়া ভোটার’ বা ‘ভুয়া পরিচয়’ ধারণ করে জাল ভোট দেওয়ার চেষ্টা করে, তবে তা হবে অত্যন্ত জঘন্য এবং ইসলামের আদর্শের পরিপন্থী।” তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, একটি অশুভ চক্র পরিকল্পিতভাবে এই পোশাক ব্যবহার করে নির্বাচনের স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার নীল নকশা সাজিয়েছে।
ভোটার পরিচয় নিশ্চিতকরণে মাহদী আমিনের প্রস্তাবনা
| প্রস্তাবিত পদক্ষেপ | বাস্তবায়নের পদ্ধতি ও লক্ষ্য |
| নারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তার উপস্থিতি | পর্দা বজায় রেখে নারী ভোটারদের মুখমণ্ডল শনাক্ত করা। |
| ছবি যাচাই (হজ/এনআইডি স্টাইল) | এনআইডি বা পাসপোর্টের মতো মুখমন্ডলের প্রয়োজনীয় অংশ উন্মোচন। |
| নারী পোলিং এজেন্টদের ভূমিকা | সন্দেহভাজন কোনো ভোটারের পরিচয় নিয়ে চ্যালেঞ্জ করা ও শনাক্তকরণ। |
| নিরাপদ শনাক্তকরণ কক্ষ | ভোটকেন্দ্রে নারী ভোটারদের গোপনীয়তা রক্ষা করে পরিচয় নিশ্চিত করা। |
| আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি | কেন্দ্রের প্রবেশপথে ছদ্মবেশধারী কেউ আছে কি না তা পর্যবেক্ষণ করা। |
নির্বাচনী কারচুপি ও জামায়াতের ভূমিকা
সংবাদ সম্মেলনে মাহদী আমিন কেবল পোশাকের অপব্যবহারই নয়, বরং নির্বাচনের দিন অবৈধ অর্থের প্রভাব খাটানোর বিষয়েও কঠোর মন্তব্য করেন। নীলফামারীর সৈয়দপুর বিমানবন্দরে ৭৪ লাখ টাকাসহ ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াত আমিরকে আটকের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “সৈয়দপুরের এই ঘটনাকে কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন বা সামান্য ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একটি দেশব্যাপী সুপরিকল্পিত নির্বাচনী প্রকৌশলের ক্ষুদ্র অংশ মাত্র।” তিনি দাবি করেন যে, বিএনপির জোয়ার ঠেকাতে বিরোধী জোটগুলো এখন কারচুপি ও অর্থের অপব্যবহারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
শান্তিপূর্ণ নির্বাচন ও ভোটাধিকার রক্ষার আহ্বান
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষ থেকে মাহদী আমিন দেশের সব রাজনৈতিক দলের প্রতি সহাবস্থান ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “সহিংসতা কোনো সমাধান নয়, বরং জনগণের আকাঙ্ক্ষা একটি শান্তিপূর্ণ ও স্বতঃস্ফূর্ত ভোট। তারেক রহমান সমাজে নারীদের অধিকার ও ধর্মীয় মর্যাদা রক্ষা করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ এবং আমরা চাই ভোটাররা যেন কোনো দ্বিধা ছাড়াই তাঁদের পবিত্র আমানত রক্ষা করতে পারেন।”
তিনি দেশের আপামর জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আগামীকাল সকালে যত দ্রুত সম্ভব আপনারা স্বপরিবারে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হোন। দেশের অপ্রতিরোধ্য জনপ্রিয়তার জোয়ারে শামিল হয়ে এই নির্বাচনে গণতন্ত্রের জয় সুনিশ্চিত করুন। জেনারেশন জেড থেকে শুরু করে প্রবীণ ভোটার—সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই নির্বাচন হবে বাংলাদেশের মানুষের মুক্তি ও বিজয়ের নতুন অধ্যায়।”
বর্তমানে দেশের প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কঠোর পর্যবেক্ষণে রয়েছে। মাহদী আমিনের এই সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনাগুলো নির্বাচন কমিশনের বিবেচনায় আসবে কি না, তা এখন দেখার বিষয়।
