২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে প্রথম জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। কাল বৃহস্পতিবার সকাল ৭টা ৩০ মিনিট থেকে বিকেল ৪টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ১২ কোটিরও বেশি ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই নির্বাচনকে ঘিরে সারাদেশে যেমন বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা বিরাজ করছে, তেমনি শেষ মুহূর্তের কিছু বিচ্ছিন্ন সহিংসতা ও নাশকতার খবর জনমনে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
Table of Contents
নির্বাচনী পরিসংখ্যান ও প্রস্তুতির রূপরেখা
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, এবারের নির্বাচনে নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে ৫টি প্রধান রাজনৈতিক দলসহ মোট ৫১টি দল অংশগ্রহণ করছে। ২৯৯টি সংসদীয় আসনে মোট ২ হাজার ৩৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। উল্লেখযোগ্য যে, শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন একজন প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে স্থগিত রাখা হয়েছে।
নিচে নির্বাচনের মূল পরিসংখ্যানগুলো একটি টেবিলের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | পরিসংখ্যান / তথ্য |
| মোট ভোটার | ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন |
| পুরুষ ও নারী ভোটার | পুরুষ: ৬.৪৮ কোটি, নারী: ৬.২৮ কোটি |
| তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার | ১ হাজার ২৩২ জন |
| মোট রাজনৈতিক দল | ৫১টি |
| মোট প্রার্থী সংখ্যা | ২ হাজার ৩৪ জন (স্বতন্ত্র: ২৭৫ জন) |
| শীর্ষ দলগুলোর প্রার্থী | বিএনপি (২৯১), ইসলামী আন্দোলন (২৫৮), জামায়াত (২২৯), জাতীয় পার্টি (১৯৮) |
| নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য | ১ লক্ষ ৮৭ হাজার ৬০৩ জন (পুলিশ) |
| আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক | ৩৯৪ জন (বিদেশি সাংবাদিক ১৯৭ জনসহ) |
নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র
সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে সারাদেশে তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম জানিয়েছেন, ৮ হাজার ৭৭০টি কেন্দ্রকে ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ এবং ১৬ হাজার কেন্দ্রকে ‘মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রের নিরাপত্তায় সিসিটিভি ক্যামেরা ও বডি-ওর্ন ক্যামেরার ব্যবহার নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। সেনাবাহিনীর পাশাপাশি বিজিবি, র্যাব ও আনসার সদস্যরা স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
সারাদেশে সংঘাত ও সহিংসতার চিত্র
নির্বাচনের তফশিল ঘোষণার পর থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রাজনৈতিক সহিংসতার খবর পাওয়া যাচ্ছে। মানবাধিকার সংস্থা ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’ (আসক) জানিয়েছে, ১ থেকে ১০ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ৫৮টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় অন্তত ২ জন নিহত ও ৪৮৯ জন আহত হয়েছেন।
নোয়াখালী ও সুবর্ণচর: হাতিয়ায় নির্বাচনী অফিস ভাঙচুর এবং বিএনপি কর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। সুবর্ণচরে এক নারী কর্মীকে পিটিয়ে আহত করার ঘটনা ঘটেছে।
বগুড়া ও ভোলা: বগুড়ার ধুনটে ছাত্রদল সভাপতি মিলন রহমানকে দুর্বৃত্তরা ছুরিকাঘাত করেছে। অন্যদিকে ভোলায় ভোট দেওয়া নিয়ে তর্কের জেরে বিএনপি ও জামায়াত কর্মীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ৫ জন আহত হয়েছেন।
গোপালগঞ্জ: গোপালগঞ্জ সদর ও টুঙ্গিপাড়ার ৭টি ভোটকেন্দ্রের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছে।
আচরণবিধি লঙ্ঘন ও অর্থ উদ্ধার
নির্বাচনের প্রাক্কালে বড় অংকের নগদ অর্থ উদ্ধার ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে বেশ কয়েকজনকে দণ্ড প্রদান করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
১. সৈয়দপুর বিমানবন্দর: ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের আমির বেলাল উদ্দিন প্রধানকে ৭৪ লক্ষ টাকাসহ আটক করা হয়েছে। যদিও জামায়াতের পক্ষ থেকে একে ‘সাজানো নাটক’ এবং ব্যবসার টাকা বলে দাবি করা হয়েছে।
২. শরীয়তপুর ও ঢাকা: শরীয়তপুরের নড়িয়ায় ৭ লক্ষ ২০ হাজার টাকাসহ এক জামায়াত কর্মীকে আটক করে ২ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রাজধানীর সূত্রাপুরে ভোটারদের টাকা বিতরণের অভিযোগে এক জামায়াত নেতাকে ২ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
৩. লক্ষ্মীপুর: লক্ষ্মীপুর-৩ আসনের প্রার্থী এ্যানী চৌধুরীর এজেন্টের গাড়ি থেকে ১৫ লক্ষ টাকা উদ্ধার করা হলেও বৈধ উৎস দেখাতে পারায় তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিক্রিয়া
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, তাদের এজেন্ট ও নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালিয়ে কেন্দ্র দখলের চেষ্টা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষ নেতারা সুষ্ঠু ভোটগ্রহণ নিয়ে তাদের আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করেছেন।
সারাদেশের ভোটারদের দৃষ্টি এখন বৃহস্পতিবারের ভোটের দিকে। প্রশাসনের কড়া নিরাপত্তা আর রাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝে সাধারণ মানুষ আশা করছেন একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের।
