যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে গঠিত তথাকথিত ‘শান্তি পরিষদে’ যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে ইতালি। গাজায় যুদ্ধ-পরবর্তী অন্তর্বর্তী প্রশাসন তদারকির লক্ষ্যে প্রস্তাবিত এই পরিষদে অংশগ্রহণের আহ্বান পেলেও রোম স্পষ্ট করে জানিয়েছে, পরিষদের কাঠামো ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ইতালির সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে দেশটি এতে যুক্ত হতে পারছে না।
ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তায়ানি শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ব্যাখ্যা করেন, ইতালির সংবিধানের ১১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কেবল সেই আন্তর্জাতিক উদ্যোগ বা সংগঠনে অংশ নেওয়া যায়, যেখানে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমতা ও সমঅধিকার নিশ্চিত থাকে। তাঁর ভাষায়, প্রস্তাবিত শান্তি পরিষদের সনদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে চেয়ারম্যান হিসেবে ভেটো ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে এবং সব সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত ব্যাখ্যা দেওয়ার একক অধিকারও তাঁর হাতে রাখা হয়েছে। এ ধরনের বিধান সদস্যদের সমান মর্যাদা ও যৌথ সার্বভৌমত্বের নীতির পরিপন্থী, যা ইতালির সংবিধান লঙ্ঘন করে।
তবে তায়ানি জোর দিয়ে বলেন, এই সিদ্ধান্তকে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং ইতালি আন্তর্জাতিক আইন ও বহুপাক্ষিক নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ যেকোনো বিশ্বাসযোগ্য উদ্যোগে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হতে প্রস্তুত। গাজায় যুদ্ধাবসানের পর স্থিতিশীলতা ফেরাতে পুলিশ প্রশিক্ষণ, বেসামরিক সুরক্ষা এবং মানবিক সহায়তার মতো বাস্তবমুখী অবদান রাখার আগ্রহও পুনর্ব্যক্ত করেছে রোম।
ইতালির অবস্থান ইউরোপের অন্যান্য বড় শক্তির সঙ্গেই সঙ্গতিপূর্ণ। ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও স্পেনও ইতোমধ্যে এই পরিষদে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাদের আপত্তির মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে শাসন কাঠামোর স্বচ্ছতা, বৈধতা এবং প্রতিষ্ঠিত বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলোকে পাশ কাটানোর প্রবণতা। ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বড় একটি অংশ কার্যত এই উদ্যোগের বাইরে থাকছে, যা পরিষদের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ কারণ ট্রাম্প ও ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির মধ্যে রাজনৈতিক সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে সৌহার্দ্যপূর্ণ বলে পরিচিত। তবু এই ঘটনায় স্পষ্ট হয়েছে, রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতারও একটি সীমা আছে—বিশেষ করে যখন সংবিধান ও আইনি কাঠামোর প্রশ্ন জড়িত থাকে।
অনেক পর্যবেক্ষক শান্তি পরিষদকে জাতিসংঘের বিকল্প বা প্রতিদ্বন্দ্বী একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। তাদের আশঙ্কা, এ ধরনের সমান্তরাল উদ্যোগ বিদ্যমান বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার বদলে দুর্বল করতে পারে। দাভোসে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করা এই পরিষদের সনদে এখন পর্যন্ত প্রায় ২০টি দেশের নেতা স্বাক্ষর করেছেন। প্রায় ৬০টি দেশকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও ইউরোপীয় অংশগ্রহণ সীমিত। ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ ওয়াশিংটনে প্রথম বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও আলোচ্যসূচি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
প্রস্তাবিত শান্তি পরিষদ: মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| আনুষ্ঠানিক সূচনা | জানুয়ারি ২০২৬, দাভোস |
| চেয়ারম্যান | ডোনাল্ড ট্রাম্প |
| সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ | প্রায় ২০টি |
| অংশগ্রহণে অনাগ্রহী ইউরোপীয় দেশ | ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, স্পেন |
| সম্ভাব্য প্রথম বৈঠক | ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ওয়াশিংটন |
| ঘোষিত লক্ষ্য | যুদ্ধবিরতি সহায়তা ও গাজার অন্তর্বর্তী প্রশাসন তদারকি |
সব মিলিয়ে, ইতালির ‘না’ শান্তি পরিষদের বৈধতা, শাসনব্যবস্থা ও কার্যকারিতা নিয়ে চলমান বিতর্ককে আরও জোরালো করেছে। ইউরোপের প্রধান শক্তিগুলো বাইরে থাকায় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—এই উদ্যোগ আদৌ গাজা সংকট সমাধান ও দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে কি না।
