বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার আন্দোলনের ইতিহাসে নাফিসা কবীর একজন অবিস্মরণীয় নারী ব্যক্তিত্ব। ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সময়, তিনি ছিলেন একজন নির্ভীক, সচেতন ও সক্রিয় প্রবাসী কর্মী। সীমান্ত পেরিয়ে তিনি বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট ছিলেন এবং প্রতিটি প্রয়াসে তাঁর অবস্থান দৃঢ় ও অটল ছিল। তার অদম্য সাহস ও মানবিকতা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
নাফিসা কবীরের পারিবারিক পটভূমি বাঙালি জাতির সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসে বিশেষ স্থান অধিকার করে। তিনি শহীদ বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লাহ কায়সার এবং কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার ও কথাসাহিত্যিক জহির রায়হানের সহোদরা বোন। এই পরিবার দেশের ইতিহাসে আলোকিত নাম হিসেবে চিরস্মরণীয়।
তার পিতা মাওলানা হাবিবউল্লাহ কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যাপক ছিলেন এবং পরবর্তীতে ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মাতা সুফিয়া খাতুন ছিলেন শিক্ষানুরাগী ও সংস্কৃতিমনা। পরিবারের পৈতৃক নিবাস ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার মজুপুর গ্রামে, যা দেশের ইতিহাসে অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের জন্মভূমি হিসেবে পরিচিত।
নাফিসা কবীর পাঁচ ভাই ও তিন বোনের মধ্যে দ্বিতীয়। শিক্ষিত, প্রগতিশীল ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ তার ব্যক্তিজীবন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর স্বামী ডা. এম. এ. কবীর একজন চিকিৎসক। দম্পতির সংসারে চার কন্যা ও এক পুত্র—যাদের তিনি শিক্ষা, শিষ্টাচার ও মানবিক চেতনায় গড়ে তুলেছিলেন।
নিম্নে নাফিসা কবীরের পরিবারের সংক্ষিপ্ত পরিচয়:
| নাম | সম্পর্ক | অবস্থান/বৃত্তি |
|---|---|---|
| শহীদুল্লাহ কায়সার | ভাই | প্রয়াত, শহীদ বুদ্ধিজীবী |
| জহির রায়হান | ভাই | প্রয়াত, চলচ্চিত্রকার ও কথাসাহিত্যিক |
| জাকারিয়া হাবিব | ভাই | প্রয়াত, চলচ্চিত্র পরিচালক |
| ওবায়দুল্লাহ মিয়াজী চৌধুরী | ভাই | যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস |
| সাইফুল্লাহ চৌধুরী | ভাই | ঢাকায় অবস্থান |
| শাহেনশাহ বেগম | একমাত্র বোন | ঢাকায় অবস্থান |
| ডা. এম. এ. কবীর | স্বামী | চিকিৎসক |
দীর্ঘ প্রবাসজীবনের পর ২০২২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি, যুক্তরাষ্ট্রের মিজৌরি অঙ্গরাজ্যের সেন্ট লুইস শহরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন।
নাফিসা কবীর ছিলেন ভাষা আন্দোলনের চেতনাশীল সৈনিক, মুক্তবুদ্ধির অনুশীলক এবং গৌরবময় পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারক। তাঁর জীবন ও কর্ম আগামী প্রজন্মের জন্য এক অনুপ্রেরণা হিসেবে চিরকাল বেঁচে থাকবে। ভাষাসৈনিক নাফিসা কবীরের প্রতি বাংলাদেশের প্রতিটি বাঙালির গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি ও কৃতজ্ঞতা অব্যাহত থাকবে।
