হিমালয়ের উচ্চভূমির শীতল মরুভূমি স্পিতি উপত্যকায় একসময় তুষার চিতাকে (তুষার চিতাবাঘ) গবাদিপশুর জন্য ভয়ংকর শত্রু বলে মনে করা হতো। পশু শিকার হলেই গ্রামবাসীর ক্ষোভ গিয়ে পড়ত এই বিরল বন্যপ্রাণীর ওপর। কিন্তু সময়ের প্রবাহে সেই বিরোধের জায়গা নিয়েছে সহাবস্থান ও সংরক্ষণের সচেতনতা। আর এই ইতিবাচক পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছেন স্থানীয় নারীদের একটি সংগঠিত দল—‘শেনমো’। স্থানীয় ভাষায় তুষার চিতাকে বলা হয় ‘শেন’, আর ‘শেনমো’ অর্থাৎ ‘শেনের রক্ষক নারী’—নামেই যেন তাদের অঙ্গীকারের প্রতিফলন।
স্পিতি উপত্যকা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১২ থেকে ১৫ হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। তীব্র ঠান্ডা, কম অক্সিজেন এবং দুর্গম পাহাড়ি পথ—এসব প্রতিকূলতার মধ্যেই শেনমো দলের সদস্যরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। ভোরের আলো ফুটতেই ঘরের কাজ শেষ করে তারা বেরিয়ে পড়েন পাহাড়ের চূড়ায়। ১৪ হাজার ফুটেরও বেশি উচ্চতায় উঠে তারা ক্যামেরা ট্র্যাপ স্থাপন করেন, নিয়মিতভাবে তথ্য সংগ্রহ করেন এবং পরে কম্পিউটারে বসে সেই ছবির বিশ্লেষণ করেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, দলের অনেক নারীই পঞ্চম শ্রেণির বেশি পড়াশোনা করেননি; তবু প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তারা এখন দক্ষতার সঙ্গে প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন।
তাদের ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফলে তুষার চিতার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সহায়তায় পরিচালিত সাম্প্রতিক গণনায় দেখা গেছে, হিমাচল অঞ্চলে তুষার চিতার সংখ্যা তিন বছরে দৃশ্যমান হারে বেড়েছে।
নিচে সংশ্লিষ্ট তথ্য উপস্থাপন করা হলোঃ
| বছর | তুষার চিতার সংখ্যা | বৃদ্ধি (সংখ্যায়) | বৃদ্ধি (শতাংশে আনুমানিক) |
|---|---|---|---|
| ২০২১ | ৫১ | — | — |
| ২০২৪ | ৮৩ | ৩২ | প্রায় ৬৩% |
এই সাফল্যের পেছনে কেবল নজরদারি নয়, রয়েছে সামাজিক সচেতনতা তৈরির উদ্যোগও। অতীতে তুষার চিতা গবাদিপশু শিকার করলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো ক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নিত। এখন শেনমো দলের নারীরা গ্রামবাসীদের সরকারি বিমা প্রকল্পে যুক্ত হতে সহায়তা করছেন। পাশাপাশি পশুর জন্য মজবুত ও নিরাপদ ঘের নির্মাণে উৎসাহ দিচ্ছেন, যাতে চিতার আক্রমণের ঝুঁকি কমে। ফলে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে।
সংরক্ষণবিদদের মতে, স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ টেকসই হয় না। স্পিতির এই নারীরা শুরুতে সামান্য আয়ের আশায় কাজ শুরু করলেও এখন তাদের প্রেরণা মূলত দায়িত্ববোধ ও পরিবেশ সচেতনতা। একসময় যে তুষার চিতাকে ‘পাহাড়ের ভূত’ বলে ভয় করা হতো, আজ সেই প্রাণীকেই রক্ষা করতে তারা নিরলস সংগ্রাম করছেন।
স্পিতি উপত্যকার এই উদ্যোগ প্রমাণ করেছে, সঠিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা থাকলে বিরল প্রজাতির সংরক্ষণে বাস্তব পরিবর্তন আনা সম্ভব। শেনমো দলের নারীরা এখন কেবল সহকারী নন; তারা পাহাড়ি জীববৈচিত্র্য রক্ষার অগ্রদূত হয়ে উঠেছেন।
