স্থানীয় সুতা ব্যবহারে পোশাক রপ্তানিতে প্রণোদনা বৃদ্ধি

বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্প শিগগিরই একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সহায়তা পেতে পারে। সরকার স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সুতা ব্যবহার করে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান নগদ সহায়তার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে। প্রস্তাব অনুযায়ী বর্তমানে ১ দশমিক ৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনা বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশে উন্নীত করা হতে পারে। অর্থাৎ অতিরিক্ত ৩ দশমিক ৫ শতাংশ প্রণোদনা যুক্ত হলে এটি সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে খাতটির জন্য অন্যতম বড় স্বল্পমেয়াদি প্রণোদনা বৃদ্ধি হিসেবে বিবেচিত হবে।

গত মঙ্গলবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক থেকে এই প্রস্তাবের সূত্রপাত হয়। বৈঠকে অর্থসচিব খাইরুজ্জামান মজুমদার, বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। আলোচনায় দেশীয় ও বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতি, সাম্প্রতিক রপ্তানি প্রবণতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর সরাসরি রপ্তানি ভর্তুকি প্রদানে সম্ভাব্য সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, স্থানীয় সুতা ব্যবহারের সঙ্গে প্রণোদনাকে যুক্ত করলে দ্বিমুখী সুফল পাওয়া যাবে। একদিকে পোশাক রপ্তানিকারকেরা ইউরোপীয় বাজারসহ বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় কমে আসা মুনাফার চাপ কিছুটা সামাল দিতে পারবেন। অন্যদিকে দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো, যেগুলো বর্তমানে অবিক্রীত সুতা ও দুর্বল চাহিদার কারণে সংকটে রয়েছে, নতুন করে অর্ডার পাবে। এতে বস্ত্র খাতের পশ্চাদ সংযোগ আরও শক্তিশালী হবে।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে সরকার অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এবং প্রধান বস্ত্র ও পোশাক সংগঠনের প্রতিনিধিদের নিয়ে দশ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। কমিটিকে দশ কার্যদিবসের মধ্যে সুপারিশ জমা দিতে বলা হয়েছে। এরপর অর্থ মন্ত্রণালয় প্রণোদনা বৃদ্ধির বিষয়ে চূড়ান্ত অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেবে।

একই দিনে অনুষ্ঠিত আরেকটি বৈঠকে অর্থসচিব তৈরি পোশাক শিল্পের নেতাদের আশ্বাস দিয়েছেন যে বকেয়া নগদ সহায়তার অন্তত ২৫ হাজার কোটি টাকা এক সপ্তাহের মধ্যে ছাড় করা হবে। বর্তমানে এ খাতে মোট বকেয়া দাবি প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। এই আংশিক ছাড় রপ্তানিকারকদের তারল্য সংকট কমাতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে, বিশেষ করে উচ্চ সুদের হার, নির্বাচন ও ঈদের ছুটিজনিত উৎপাদন ব্যাঘাতের প্রেক্ষাপটে।

নিটওয়্যার শিল্পের নেতারা সতর্ক করে বলেছেন, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিধির কারণে সরাসরি নগদ প্রণোদনা দেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে হাতে থাকা সীমিত সময়ের মধ্যে এই সহায়তা কার্যকর করা জরুরি। তবে আমদানি করা সুতার ওপর শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রত্যাহারের প্রস্তাব নিয়ে শিল্পের ভেতরে এখনও মতবিরোধ রয়ে গেছে।

টেক্সটাইল মিল মালিকদের একাংশ অবৈধভাবে সুতা আমদানির অভিযোগ তুলে কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, জাল সনদ ও ভুয়া ঘোষণার মাধ্যমে বিদেশি সুতা দেশে প্রবেশ করায় স্থানীয় উৎপাদকরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন।

সামগ্রিকভাবে, রপ্তানি আদেশ হ্রাস, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি ও পরিচালন ব্যয়ের চাপের মধ্যে প্রস্তাবিত নগদ প্রণোদনা বৃদ্ধি তৈরি পোশাক ও স্পিনিং—উভয় খাতকে স্বল্পমেয়াদে প্রয়োজনীয় গতি দিতে পারে বলে নীতিনির্ধারক ও শিল্পসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

প্রস্তাবিত নগদ প্রণোদনার চিত্র

বিষয়বর্তমান অবস্থাপ্রস্তাবিত অবস্থা
নগদ প্রণোদনার হার১ দশমিক ৫ শতাংশ৫ শতাংশ
অতিরিক্ত প্রণোদনাপ্রযোজ্য নয়৩ দশমিক ৫ শতাংশ
মোট বকেয়া নগদ সহায়তা৬০ হাজার কোটি টাকাআংশিক ছাড় প্রক্রিয়াধীন
কমিটির প্রতিবেদন সময়সীমানেই১০ কার্যদিবস

এই প্রণোদনা বাস্তবায়িত হলে পরিবর্তনশীল সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের পোশাক রপ্তানি ব্যবস্থায় স্বস্তি ফিরতে পারে।