কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনকে ঘিরে নতুন নথিপত্র প্রকাশের পর বিশ্বজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। কয়েক বছর আগে কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে এপস্টেইনের রহস্যজনক মৃত্যুর পর ধারণা করা হয়েছিল, অনেক গোপন সত্য হয়তো তার সঙ্গেই চিরতরে তলিয়ে গেছে। কিন্তু মার্কিন বিচার বিভাগ কর্তৃক সদ্য প্রকাশিত কয়েক লক্ষ পৃষ্ঠার নথি সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে। এই নথিপত্রে বিশ্বের এমন সব ব্যক্তিদের নাম জড়িয়েছে, যারা রাজনীতি, ব্যবসা এবং রাজকীয় আভিজাত্যের শীর্ষে অবস্থান করছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে শুরু করে বিল গেটস কিংবা ব্রিটিশ রাজপরিবার—কেউই এই কলঙ্কিত নথির তালিকা থেকে বাদ পড়েননি।
Table of Contents
জেফরি এপস্টেইন ও যৌনবৃত্তির অন্ধকার জগত
জেফরি এপস্টেইন ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের একজন প্রভাবশালী অর্থলগ্নি কারক, যার বিরুদ্ধে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের ব্যবহার করে যৌনবৃত্তির এক বিশাল আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার অভিযোগ ছিল। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের লালসা মেটাতে তিনি তার ব্যক্তিগত ক্যারিবীয় দ্বীপ ‘লিটল সেন্ট জেমস’ ব্যবহার করতেন। ২০১৯ সালে বিচারের অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় কারাগারে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। যদিও ময়নাতদন্তে একে আত্মহত্যা বলা হয়েছে, তবে অনেক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আজও অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
নতুন নথির বিশালতা ও প্রকাশের প্রেক্ষাপট
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নির্দেশে এবং বর্তমান ও সাবেক নীতিনির্ধারকদের চাপের মুখে বিচার বিভাগ এই তথ্যভাণ্ডার উন্মুক্ত করেছে। প্রায় ৩০ লক্ষ পৃষ্ঠা, ১ লক্ষ ৮০ হাজার স্থিরচিত্র এবং ২ হাজার ভিডিও সম্বলিত এই নথিগুলোতে গত এক দশকের বেশি সময়ের ই-মেইল চালাচালি এবং গোপন যোগাযোগের চিত্র ফুটে উঠেছে।
নথিতে যাদের নাম আলোড়ন তুলেছে
প্রকাশিত এই দলিলে ব্যক্তিভেদে অভিযোগের ধরণ ভিন্ন হলেও সবার ক্ষেত্রে একটি বিষয় স্পষ্ট—এপস্টেইনের বিতর্কিত জীবনের সাথে তাদের কোনো না কোনো স্তরে যোগাযোগ ছিল।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বিল ক্লিনটন
তালিকায় শীর্ষ দুই নাম হলো সাবেক দুই মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কিছু অপ্রাপ্তবয়স্ক তরুণীকে হেনস্তার অভিযোগ নথিতে থাকলেও এফবিআই সেগুলোর সত্যতা নিয়ে সন্দিহান। তবে ট্রাম্পের স্ত্রী মেলানিয়া ট্রাম্পের পক্ষ থেকে এপস্টেইনকে পাঠানো সৌজন্যমূলক ই-মেইল নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অন্যদিকে, বিল ক্লিনটনের ক্ষেত্রে দেখা গেছে তিনি একাধিকবার এপস্টেইনের ব্যক্তিগত বিমানে যাতায়াত করেছেন এবং হোয়াইট হাউসে তার সাথে সাক্ষাৎ করেছেন।
বিল গেটস ও ইলন মাস্ক
প্রযুক্তি বিশ্বের দুই সম্রাটও বাদ যাননি। নথিতে উল্লেখ রয়েছে যে, বিল গেটসের বৈবাহিক জীবনের টানাপোড়েন এবং তার বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের জন্য সুযোগ তৈরি করে দিতেন এপস্টেইন। বিশেষ করে রুশ তরুণীদের সাথে গেটসের সম্পর্কের মধ্যস্থতা করার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে ই-মেইলে। অন্যদিকে, টেসলা প্রধান ইলন মাস্কের সাথে এপস্টেইনের ই-মেইল আদান-প্রদানে দেখা যায়, মাস্ক এপস্টেইনের ব্যক্তিগত দ্বীপে আয়োজিত পার্টিতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন।
ব্রিটিশ রাজপরিবার ও অন্যান্যরা
ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য প্রিন্স অ্যান্ড্রু বা অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন উইন্ডসরের সাথে এপস্টেইনের ঘনিষ্ঠতা আবারও প্রমাণিত হয়েছে। নথিতে বাকিংহাম প্যালেসে এপস্টেইনকে আমন্ত্রণ জানানো এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বজায় রেখে ডিনারের পরিকল্পনার প্রমাণ মিলেছে। এছাড়াও ধনকুবের রিচার্ড ব্র্যানসন এবং বর্তমান মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিকের নামও এই কলঙ্কিত তালিকায় উঠে এসেছে।
এক নজরে এপস্টেইন নথির প্রধান প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ
নিচে নথিতে উল্লিখিত ব্যক্তিদের সংক্ষিপ্ত তালিকা ও তাদের বিরুদ্ধে আসা তথ্যের বিবরণ দেওয়া হলো:
| ব্যক্তির নাম | পদমর্যাদা/পরিচয় | নথিতে প্রাপ্ত তথ্যের সারসংক্ষেপ |
| ডোনাল্ড ট্রাম্প | সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট | যৌন নিপীড়নের অভিযোগ এবং মেলানিয়া ট্রাম্পের ই-মেইল। |
| বিল ক্লিনটন | সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট | এপস্টেইনের বিমানে ভ্রমণ ও হোয়াইট হাউসে সাক্ষাৎ। |
| বিল গেটস | মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা | বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের ক্ষেত্রে এপস্টেইনের মধ্যস্থতা। |
| ইলন মাস্ক | প্রযুক্তি উদ্যোক্তা (টেসলা, এক্স) | এপস্টেইনের ব্যক্তিগত দ্বীপের পার্টিতে যোগদানের পরিকল্পনা। |
| অ্যান্ড্রু উইন্ডসর | ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য | বাকিংহাম প্যালেসে এপস্টেইনকে আমন্ত্রণ ও গোপন বৈঠক। |
| রিচার্ড ব্র্যানসন | ধনকুবের (ভার্জিন গ্রুপ) | এপস্টেইনের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও ই-মেইল যোগাযোগ। |
| হাওয়ার্ড লুটনিক | মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী | এপস্টেইনের দ্বীপে সস্ত্রীক ভ্রমণের পরিকল্পনা। |
| পিটার ম্যান্ডেলসন | ব্রিটিশ রাজনীতিক | নথিতে নাম আসার পর পদত্যাগ করেছেন। |
সামাজিক ও আইনি প্রভাব
এই নথি প্রকাশের পর জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে ভুক্তভোগী নারীদের পক্ষ থেকে দাবি উঠেছে, যারা এপস্টেইনের এই ঘৃণ্য নেটওয়ার্কের সুবিধাভোগী ছিলেন, তাদের প্রত্যেকের বিচার হওয়া প্রয়োজন। প্রভাবশালী অনেক ব্যক্তিই একে ‘ভুল বোঝাবুঝি’ বা ‘অতিরঞ্জিত’ বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও ডিজিটাল প্রমাণের পাহাড় তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, এপস্টেইন নথিপত্র কেবল কিছু ব্যক্তির অপরাধের দলিল নয়, বরং এটি ক্ষমতার অপব্যবহার ও নৈতিক স্খলনের এক কুৎসিত দর্পণ। এই তদন্তের গতিপ্রকৃতি আগামী দিনে বৈশ্বিক রাজনীতি ও সমাজ ব্যবস্থার অনেক রাঘববোয়ালের মুখোশ উন্মোচন করতে পারে।
