গ্রিনল্যান্ডে রুশ-চীন হুমকি পশ্চিমের সাজানো ‘ভয়ংকর রূপকথা’

আর্কটিক অঞ্চল বা উত্তর মেরুর কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড গ্রিনল্যান্ডকে কেন্দ্র করে ভূ-রাজনীতি বর্তমানে নতুন এক উত্তেজনার মোড় নিয়েছে। গ্রিনল্যান্ডের ওপর রাশিয়া বা চীনের সম্ভাব্য হুমকির বিষয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সাম্প্রতিক দাবিকে স্রেফ ‘ভয়ংকর রূপকথা’ বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সাজানো গল্প হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের উপ-চেয়ারম্যান দিমিত্রি মেদভেদেভ। সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) নিজস্ব বাসভবনে রয়টার্স ও তাস নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এই মন্তব্য করেন।

মেদভেদেভের বক্তব্য ও পশ্চিমের সমালোচনা

দিমিত্রি মেদভেদেভ জোর দিয়ে বলেন, পশ্চিমা বিশ্বের প্রভাবশালী নেতারা নিজেদের অভ্যন্তরীণ স্বার্থ রক্ষা এবং বিভিন্ন দেশে তাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের যৌক্তিকতা প্রমাণের জন্যই রাশিয়া ও চীনের নাম ব্যবহার করে একটি কাল্পনিক ভয়ের পরিবেশ তৈরি করছেন। তার মতে, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে রাশিয়া বা চীনের কোনো আগ্রাসী পরিকল্পনা নেই; বরং পশ্চিমারাই এই অঞ্চলটিকে নিয়ে একটি ‘রাজনৈতিক প্রচারণা’র হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

মেদভেদেভ আরও উল্লেখ করেন যে, গ্রিনল্যান্ড ইস্যুটি বর্তমানে আটলান্টিক ঐক্যের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। তিনি ইঙ্গিত দেন, এই বিষয়টি নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে শীঘ্রই বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে। এমনকি সামরিক হস্তক্ষেপ বা ন্যাটো জোটের ভেতরে বড় কোনো ফাটল সৃষ্টি হওয়ার আগেই হয়তো কোনো শান্ততর উপায়ে বিষয়টি মীমাংসা হতে পারে। তবে এই সংকটে রাশিয়া বা চীনকে জড়ানো ভিত্তিহীন বলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন।

গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত গুরুত্ব ও বৈশ্বিক টানাপোড়েন

গ্রিনল্যান্ড ভৌগোলিকভাবে উত্তর আমেরিকা মহাদেশের কাছে অবস্থিত হলেও রাজনৈতিকভাবে এটি ডেনমার্কের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর কৌশলগত অবস্থান এবং খনিজ সম্পদের বিশাল ভাণ্ডার বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর নজর কেড়েছে। পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর পক্ষ থেকে প্রায়ই অভিযোগ করা হয় যে, উত্তর মেরু অঞ্চলে রাশিয়া তাদের সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে এবং চীন খনিজ সম্পদে বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করছে।

নিচে গ্রিনল্যান্ডকে কেন্দ্র করে প্রধান শক্তিগুলোর অবস্থান ও সংকটের মূল বিন্দুগুলো টেবিলের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:

বিষয়বিবরণ ও বর্তমান পরিস্থিতি
ভৌগোলিক অবস্থানউত্তর মেরু (আর্কটিক) অঞ্চল; উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের সংযোগস্থল।
মূল সম্পদবিরল খনিজ (Rare Earth Elements), তেল, গ্যাস এবং বিশুদ্ধ পানির উৎস।
পশ্চিমের দাবিরাশিয়া ও চীন গ্রিনল্যান্ডের সামরিক ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়।
রাশিয়ার অবস্থানঅভিযোগ অস্বীকার; গ্রিনল্যান্ড নিয়ে পশ্চিমের দাবিকে ‘ভয়ংকর রূপকথা’ বলা।
চীনের ভূমিকাখনিজ উত্তোলন ও অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগের আগ্রহ।
নিরাপত্তা ঝুঁকিন্যাটোর সামরিক ঘাঁটি (থুল এয়ার বেস) এবং আর্কটিক অঞ্চলের সার্বভৌমত্ব।

ভবিষ্যতের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ

বিশ্লেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আর্কটিক অঞ্চলের বরফ গলে যাওয়ার কারণে নতুন নৌপথ তৈরি হচ্ছে, যা এশিয়ার সাথে ইউরোপের দূরত্ব কমিয়ে দেবে। ফলে গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া বা সেখানে প্রভাব রাখা এখন রাশিয়ার উত্তর মেরু নীতির (Arctic Policy) অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অন্যদিকে, চীন নিজেদের ‘মেরু রেশম পথ’ (Polar Silk Road) গড়ার অংশ হিসেবে এখানে বিনিয়োগ করতে চায়।

মেদভেদেভ তার সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করেছেন যে, পশ্চিমারা আসলে রাশিয়ার অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতাকে ভয় পায় বলেই গ্রিনল্যান্ডের মতো বিষয়গুলোতে ছায়া যুদ্ধ (Proxy War) শুরু করতে চায়। তিনি মনে করেন, গ্রিনল্যান্ডের জনগণের নিজস্ব সার্বভৌমত্ব এবং উন্নয়নের অধিকার রয়েছে, যা পশ্চিমা স্বার্থের বলি হওয়া উচিত নয়। এই পরিস্থিতি ভবিষ্যতে ন্যাটো জোটের ভেতরে ডেনমার্ক, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও বাড়িয়ে দেবে কি না, তা এখন দেখার বিষয়।