স্বর্ণবাজারে অস্থিরতা, দাম উঠানামা অব্যাহত

দেশের স্বর্ণবাজারে চলছে তীব্র অস্থিরতা। একদিনের মধ্যে একাধিকবার দাম ওঠানামা হওয়ায় সাধারণ ক্রেতাদের জন্য বাজার বিভ্রান্তিকর হয়ে উঠেছে। গত শনিবার সকালেই ২২ ক্যারেটের স্বর্ণের প্রতি ভরি দাম হঠাৎ ১৬ হাজার টাকা কমানো হয়েছিল; তবে বিকেলেই তা পুনরায় বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস) সর্বশেষ ঘোষিত মূল্যে ২২ ক্যারেট স্বর্ণ বিক্রি হচ্ছে প্রতি ভরি ২,৫১,১৮৪ টাকায়।

এর আগে বৃহস্পতিবার দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ স্বর্ণমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। ওই দিন প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম দাঁড়ায় ২,৮৬,০০০ টাকায়। এক বছর আগে একই পরিমাণ স্বর্ণের দাম ছিল মাত্র ১,৩৫,০০০ টাকা, যা মাত্র এক বছরে ভরিপ্রতি ১,৫১,০০০ টাকার বিশাল বৃদ্ধি নির্দেশ করে। ৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ৩–৬ শতাংশ মজুরি যোগ করলে বর্তমানে বৈধভাবে ভালো মানের এক ভরি স্বর্ণ কিনতে প্রায় ৩ লাখ টাকা প্রয়োজন।

উচ্চমূল্যের কারণে ক্রেতা ও বিক্রেতা—উভয়েই হতাশ। জুয়েলারি দোকানগুলোতে বিক্রি কার্যত বন্ধের মুখে। বাজুসের ব্যবসায়ীরা জানান, বিশ্ববাজারে স্বর্ণের ঊর্ধ্বমুখী দামের প্রভাব সরাসরি দেশের বাজারে পড়ছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আন্তর্জাতিক অস্থিরতা ও মন্দার আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে স্বর্ণে ঝুঁকছেন। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যসংঘাত, ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারপারসনের নিয়োগ, শেয়ারবাজারের অস্থিরতা এবং বন্ড ও ব্যাংক আমানতের সুদের হ্রাস—all মিলিয়ে স্বর্ণের বাজার উত্তাল।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এসব অনিশ্চয়তায় বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণকে সবচেয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ মনে করছেন। এছাড়া, বিদেশ থেকে স্বর্ণ আমদানি কঠোর ব্যাগেজ নিয়মের কারণে দেশীয় বাজারেও দাম বাড়ছে।

বাংলাদেশে স্বর্ণের মানভেদ ও সর্বশেষ দাম নিচের টেবিলে দেওয়া হলো:

স্বর্ণের ধরনবিশুদ্ধতাবর্তমান দাম প্রতি ভরি (টাকা)সোমবার সকাল ১১টা পর্যন্ত দাম (টাকা)
২২ ক্যারেট91.6%2,51,1842,57,774
২১ ক্যারেট87.5%2,39,7542,46,052
১৮ ক্যারেট75%2,05,5202,10,885
সনাতন পদ্ধতি~60%1,68,1951,72,569

দেশে বছরে স্বর্ণের চাহিদা প্রায় ২১ টন। তবে বৈধ আমদানি সীমিত থাকায় চোরাচালানের ওপর নির্ভরতা বেশি। উচ্চমূল্যের কারণে ক্রেতারা এখন সিটি গোল্ড ও গোল্ড প্লেটেড অলংকারের দিকে ঝুঁকছেন।

বাজুসের সাবেক সহসভাপতি এমএ হান্নান আজাদ বলেন, “বিশ্বযুদ্ধ, আন্তর্জাতিক অস্থিরতা বা রাজনৈতিক উত্তেজনা শুরু হলেই স্বর্ণের দাম বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে দেশের স্বর্ণবাজার ভয়াবহ সংকটে রয়েছে। ক্রেতা নেই, দোকানগুলো ফাঁকা, অনেক ব্যবসায়ী ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন।”

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, স্বর্ণের এই অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত ক্রেতাদের জন্য এটি ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে। বিশেষ করে রমজান ও ঈদ মৌসুমে বাজারের এই পরিস্থিতি স্বর্ণের বিক্রয়কে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।