বাংলাদেশের জননিরাপত্তা ও সামাজিক কাঠামোর অন্যতম স্তম্ভ স্বাস্থ্যখাত আজ এক গভীর সংকটের আবর্তে নিমজ্জিত। দেশের সরকারি হাসপাতাল, জেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং তৃণমূলের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো সাধারণ মানুষের শেষ ভরসাস্থল হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে তা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। হাজার হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রতি বছর বরাদ্দ হওয়া সত্ত্বেও সেবার মান এবং অবকাঠামোগত উন্নতির সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাচ্ছে না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও এর সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরগুলোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাসা বাঁধা দুর্নীতি, প্রশাসনিক স্থবিরতা এবং অনিয়ম এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।
প্রশাসনিক স্থবিরতা ও দুর্নীতির চিত্র
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের একাংশের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে, তারা জনসেবার চেয়ে ব্যক্তিগত পদোন্নতি, বদলি বাণিজ্য এবং দলীয় স্বার্থ রক্ষায় অধিক মনোযোগী। বিগত সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত অনেক কর্মকর্তা এখনও প্রভাবশালী পদে আসীন থেকে প্রশাসনিক কাজকর্মে ধীরগতি এবং দীর্ঘসূত্রতা বজায় রাখছেন বলে জনমনে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। জীবন রক্ষাকারী ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করা, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রয় এবং জনবল নিয়োগের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে স্বচ্ছতার বদলে অস্বচ্ছতাই এখন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিচে দেশের স্বাস্থ্যখাতের বর্তমান সংকট ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
| সংকটের ক্ষেত্র | বর্তমান পরিস্থিতি | প্রত্যাশিত সংস্কার ও পদক্ষেপ |
| প্রশাসনিক গতিশীলতা | পদোন্নতি ও স্বার্থ কেন্দ্রিক দলাদলি। | যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ ও দক্ষ আমলাতন্ত্র। |
| বাজেট ব্যবস্থাপনা | কেনাকাটায় দুর্নীতি ও বরাদ্দ লোপাট। | ক্রয়ের ক্ষেত্রে ই-টেন্ডারিং ও কঠোর অডিট। |
| তৃণমূল স্বাস্থ্যসেবা | জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ডাক্তার ও সরঞ্জামের অভাব। | বিকেন্দ্রীকরণ ও মফস্বলে ডাক্তারদের উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ। |
| জবাবদিহিতা | দুর্নীতির অভিযোগে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। | অভিযোগ আমলে নিয়ে দ্রুত বিচারিক তদন্ত ও শাস্তি। |
জনভোগান্তি ও সাধারণ মানুষের হাহাকার
দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা রোগীরা যখন সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন, তখন তাদের পোহাতে হয় অন্তহীন দুর্ভোগ। শয্যার অভাব, নষ্ট হয়ে পড়ে থাকা এক্স-রে বা ইসিজি মেশিন এবং দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য সাধারণ মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবাকে এক দুঃস্বপ্নে পরিণত করেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অবহেলার কারণে সময়মতো ওষুধ ও লজিস্টিক সাপোর্ট না আসায় অনেক ক্ষেত্রে বিনা চিকিৎসায় প্রাণহানির মতো ঘটনাও ঘটছে। অথচ এই মন্ত্রণালয়ের মূল লক্ষ্য ছিল জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
উত্তরণের পথ ও ভবিষ্যৎ ভাবনা
স্বাস্থ্যখাতকে দুর্নীতির অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে হলে কেবল বাজেট বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়, বরং নীতিগত শৃঙ্খলা ও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। মন্ত্রণালয়ের শীর্ষপদস্থদের এখন সময় এসেছে জনগণের প্রত্যাশা অনুধাবন করার। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে পেশাদারিত্বের সাথে দায়িত্ব পালন না করলে এই বিশাল জনপদ শুধু রোগের কাছেই নয়, দুর্নীতির কাছেও পরাজিত হবে। ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করে ওষুধের মজুদ এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের ব্যবহার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
পরিশেষে বলা যায়, স্বাস্থ্য কোনো রাজনৈতিক পণ্য নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। যদি এখনই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না যায়, তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সাধারণ মানুষের আস্থা পুরোপুরি হারাবে। সময় এসেছে আমূল সংস্কারের মাধ্যমে স্বাস্থ্য সেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার।
