নরওয়ের রাজপরিবারকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে ক্রাউন প্রিন্সেস মেট্টে-মারিটের ছেলে মারিয়ুস বর্গ হইবির বিরুদ্ধে চলমান ধর্ষণ মামলা। রাজধানী অসলোতে বিচার কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকেই এটি দেশটির সামাজিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। রাজপরিবার সাধারণত নরওয়ের জনগণের কাছে স্থিতিশীলতা ও নৈতিকতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হলেও এই মামলাটি সেই ভাবমূর্তিকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
২৯ বছর বয়সী মারিয়ুস বর্গ হইবির বিরুদ্ধে মোট ৩৮টি অভিযোগ আনা হয়েছে, যা মামলাটিকে আরও জটিল ও গুরুতর করে তুলেছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে চারজন নারীকে ধর্ষণ, সাবেক বান্ধবীকে শারীরিক নির্যাতন ও প্রাণনাশের হুমকি, সম্পত্তি ভাঙচুর, মাদক সংক্রান্ত অপরাধ এবং একাধিক ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন। অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ধর্ষণের ঘটনাগুলো ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে একটি ঘটনায় অভিযোগকারী নারী ঘুমন্ত অবস্থায় যৌন নিপীড়নের শিকার হন বলে আদালতে উল্লেখ করা হয়েছে।
নরওয়ের আদালত এই মামলাকে অত্যন্ত সংবেদনশীল বিবেচনায় নিয়ে বিচার চলাকালে ছবি তোলা ও ভিডিও ধারণের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। সাত সপ্তাহব্যাপী এই বিচার চলাকালে একাধিক ভুক্তভোগী ও সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে। নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার স্বার্থে তাঁদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বড় পরিসরের অভিযোগ ও সাক্ষ্যপ্রমাণ থাকায় এটি নরওয়ের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ ও আলোচিত বিচার হতে পারে।
সেলিব্রিটি ও সমাজবিষয়ক সাময়িকী সে ও হর-এর সম্পাদক নিকলাস কোক্কিন-থোরেসেন মন্তব্য করেছেন, এই মামলা নরওয়ের রাজপরিবারের জন্য “সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারি”। তাঁর মতে, অভিযুক্ত ব্যক্তি সরাসরি রাজপরিবারের সদস্য না হলেও ক্রাউন প্রিন্সেসের সন্তান হওয়ায় বিষয়টি এড়ানো সম্ভব নয়। ফলে রাজপরিবারের ওপর গণমাধ্যমের নজর ও জনমতের চাপ বহুগুণে বেড়েছে।
অন্যদিকে, মারিয়ুস হইবির আইনজীবী পেতার সেকুলিচ জানিয়েছেন, তাঁর মক্কেল অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন, তবে যৌন নির্যাতন ও সহিংসতার অধিকাংশ অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেছেন। আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি পূর্ণ আস্থা রাখার কথাও জানান তিনি। দোষী প্রমাণিত হলে হইবির ১০ বছরের বেশি কারাদণ্ড হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ক্রাউন প্রিন্স হাকন এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে অভিযোগকারী ভুক্তভোগীদের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেছেন এবং বলেছেন, বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের ওপর রাজপরিবারের পূর্ণ আস্থা রয়েছে। তবে রাজপরিবারের পক্ষ থেকে মামলার বিষয়ে এর বেশি মন্তব্য করা হয়নি।
শৈশব থেকেই মারিয়ুস হইবি নরওয়ের সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত মুখ। অতীতে তিনি মাদকাসক্তি ও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগার কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করেছিলেন। অনেকেই মনে করছেন, ব্যক্তিগত এসব সংকট এবং বর্তমান গুরুতর অভিযোগ মিলিয়ে রাজপরিবারের সামাজিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত জীবনের সীমারেখা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
নিচে মামলার প্রধান অভিযোগগুলোর সংক্ষিপ্ত তথ্য টেবিল আকারে তুলে ধরা হলো
| অভিযোগের ধরন | অভিযোগের সংখ্যা |
|---|---|
| ধর্ষণ | ৪ |
| শারীরিক নির্যাতন ও হুমকি | একাধিক |
| সম্পত্তি ভাঙচুর | একাধিক |
| মাদক সংক্রান্ত অপরাধ | একাধিক |
| ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন | একাধিক |
সব মিলিয়ে, এই মামলা শুধু একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়; এটি নরওয়ের রাজপরিবার, বিচারব্যবস্থা এবং সমাজে ক্ষমতা ও জবাবদিহির সম্পর্ক নিয়ে গভীর আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিচার শেষে রায় যাই হোক না কেন, এই ঘটনাটি নরওয়ের আধুনিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
