চার বছরে দেশে তরমুজ উৎপাদন দ্বিগুণ

গ্রীষ্মকালীন রসালো ফল তরমুজের চাহিদা ও চাষাবাদ বাংলাদেশে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত চার বছরে দেশে তরমুজ উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণে উন্নীত হয়েছে। মূলত উপকূলীয় অঞ্চলের চরাঞ্চলে চাষাবাদ সম্প্রসারণ এবং অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এই উচ্চ প্রবৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে।

উৎপাদন বৃদ্ধির পরিসংখ্যান

২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে মোট তরমুজ উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ৮৯ হাজার টন। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী, এই উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫ লাখ ৫২ হাজার টনে। কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, অধিক লাভজনক হওয়ায় কৃষকরা প্রতিবছর নতুন নতুন জমি তরমুজ চাষের আওতায় আনছেন। বিশেষ করে ভোলা, পটুয়াখালী ও বরগুনার মতো জেলাগুলো এখন দেশের প্রধান তরমুজ উৎপাদনকারী অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।

নিচে গত চার অর্থবছরের উৎপাদন চিত্র তুলে ধরা হলো:

অর্থবছরউৎপাদনের পরিমাণ (লাখ টন)
২০২০-২১১৭.৮৯
২০২১-২২২৫.৪৭
২০২২-২৩৩৬.৩৬
২০২৪-২৫৩৫.৫২

বাজারদর ও সরবরাহ পরিস্থিতি

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও তরমুজের উৎপাদন ঊর্ধ্বমুখী থাকবে বলে ডিএই এবং ব্যবসায়ীরা পূর্বাভাস দিয়েছেন। পর্যাপ্ত সরবরাহের কারণে বিগত বছরের তুলনায় বাজারে তরমুজের দাম এবার তুলনামূলক স্থিতিশীল ও সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে রয়েছে। মার্চ ও এপ্রিল মাস তরমুজের ভরা মৌসুম হওয়ায় রাজধানীর পাইকারি ও খুচরা বাজারে ব্যাপক সরবরাহ দেখা যাচ্ছে।

গত বছরের এপ্রিলে প্রতি কেজি তরমুজের দাম ৫০ থেকে ৬০ টাকা থাকলেও, এ বছর মৌসুমের শুরুতে তা ৩০ থেকে ৩৫ টাকায় নেমে আসে। পাইকারি বাজার যেমন কারওয়ান বাজারে এটি ২৫ থেকে ৩০ টাকা কেজিতেও বিক্রি হতে দেখা গেছে। তবে মৌসুমের শেষের দিকে বর্তমানে চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য পরিবর্তনের ফলে দাম কিছুটা বৃদ্ধি পেয়ে ৪৫ থেকে ৫০ টাকার আশেপাশে অবস্থান করছে।

স্বাদ ও গুণমান নিয়ে বিশেষজ্ঞ মতামত

ফলন বৃদ্ধি পেলেও এবার তরমুজের স্বাদ ও মিষ্টতা নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেক ক্রেতার অভিযোগ, তরমুজের ভেতর লাল হলেও তা আশানুরূপ মিষ্টি নয় এবং দ্রুত পচে যাচ্ছে। ফল বিশেষজ্ঞরা এর পেছনে বেশ কিছু কারিগরি কারণ চিহ্নিত করেছেন:

১. অপরিণত ফল সংগ্রহ: স্বল্প সময়ে অধিক লাভের আশায় অনেক চাষি ফল পুরোপুরি পরিপক্ব হওয়ার আগেই বাজারজাত করছেন।

২. রাসায়নিকের ব্যবহার: বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষাবাদ বাড়ায় দ্রুত ফল বড় করার জন্য অতিরিক্ত সার, কীটনাশক ও হরমোনের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে।

৩. জলাধিক্য: ফল অতিমাত্রায় বড় করার প্রক্রিয়ায় এতে পানির পরিমাণ বেড়ে গিয়ে মিষ্টতা বা সুগার কনসেন্ট্রেশন কমে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ফলিত পুষ্টি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (বারটান) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আবদুর রাজ্জাক জানান, হরমোন ব্যবহারের কারণে স্বাদে কিছুটা তারতম্য হলেও অতিরিক্ত পরিমাণে না খেলে এটি স্বাস্থ্যের জন্য বড় কোনো ঝুঁকি তৈরি করবে না।

উপকূলীয় অঞ্চলের ভূমিকা ও চাষাবাদ ব্যয়

বাংলাদেশের তরমুজ উৎপাদনের মূল কেন্দ্রবিন্দু দক্ষিণবঙ্গের উপকূলীয় জেলাগুলো। বিশেষ করে পটুয়াখালী উৎপাদনে শীর্ষে রয়েছে, যার পরেই ভোলা ও বরগুনার অবস্থান। শুধু ভোলা জেলাতেই ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৮ লাখ টন তরমুজ উৎপাদিত হয়েছে। এ বছর ভোলায় চাষাবাদের জমির পরিমাণও গতবারের চেয়ে প্রায় ৪ হাজার হেক্টর বৃদ্ধি পেয়েছে।

চাষাবাদের আর্থিক দিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, তরমুজ চাষ অত্যন্ত লাভজনক। খুলনার দাকোপ অঞ্চলের কৃষকদের তথ্যমতে, প্রতি বিঘা জমিতে তরমুজ চাষে খরচ হয় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। ফলন ভালো হলে এবং বাজার পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে সেই জমি থেকে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার ফল বিক্রি করা সম্ভব। মৌসুমের শেষের দিকে বাজারে আসা ‘নাবি’ জাতের তরমুজের ক্ষেত্রে লাভের পরিমাণ আরও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষকরা আধুনিক সেচ ও চাষ পদ্ধতি ব্যবহার করে এই উচ্চফলন নিশ্চিত করছেন।