যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের উত্তেজনা নতুন করে ভয়াবহ রূপ নিতে চলেছে। ইরানের বিরুদ্ধে একটি বড় ধরনের সামরিক অভিযানের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে ওয়াশিংটন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ড্রপ সাইট নিউজ-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চাইলে আজই ইরানের ওপর সুপরিকল্পিত হামলার নির্দেশ দিতে পারেন। এই সম্ভাব্য অভিযানের খবরে শুধু তেহরান নয়, গোটা মধ্যপ্রাচ্যজুড়েই চরম উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য এই সামরিক অভিযানের লক্ষ্য কেবল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা বা ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করা নয়। বরং এর গভীরতর উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে তথাকথিত ‘শিরচ্ছেদ কৌশল’ প্রয়োগ করা। মার্কিন যুদ্ধ পরিকল্পনাকারীদের ধারণা, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর নেতৃত্বকে সরিয়ে দিতে পারলে ইরানের অভ্যন্তরে ব্যাপক গণঅসন্তোষ তৈরি হবে এবং এর মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের পথ প্রশস্ত হতে পারে।
একজন সাবেক শীর্ষ মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই হামলার বিষয়ে অত্যন্ত আগ্রহী। তিনি ট্রাম্পকে আশ্বস্ত করেছেন যে, তেহরানে যদি পশ্চিমাপন্থী কোনো নতুন সরকার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়, তবে ইসরাইল সর্বাত্মক সহযোগিতা দেবে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সমন্বয় নতুন কোনো বিষয় নয়, তবে এবারের পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
এই উত্তেজনার মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজে ওভাল অফিসে দেওয়া এক বক্তব্যে ইরানের দিকে বিশাল মার্কিন নৌবহর অগ্রসর হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলো দ্রুত তাদের অবস্থান স্পষ্ট করতে শুরু করেছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রকাশ্যে জানিয়েছে, তারা ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক অভিযানে নিজেদের আকাশসীমা কিংবা আঞ্চলিক জলসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেবে না। এ অবস্থান থেকে বোঝা যাচ্ছে, অঞ্চলটির মিত্র দেশগুলোর মধ্যেও বিভক্তি স্পষ্ট।
অন্যদিকে, সম্ভাব্য হামলার জবাবে ইরানও নজিরবিহীন পাল্টা হুমকি দিয়েছে। দেশটির সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আক্রমিনিয়া কড়া ভাষায় সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে স্বল্প সময়ের অভিযানে যুদ্ধ শেষ করা যাবে, তবে তা মারাত্মক ভুল হিসাব হবে। তার ভাষায়, হামলা হলে যুদ্ধ শুধু ইরানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়বে।
ইরানের দাবি অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন থাকা প্রায় ৪০ হাজার মার্কিন সেনা এবং তাদের ঘাঁটিগুলো ইরানি ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। দেশটির সামরিক নেতৃত্ব এবার ‘সীমিত প্রতিক্রিয়া’ নীতির পরিবর্তে কঠোর জবাব দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যেখানে বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না।
তবে যুদ্ধের এই ঘনঘটার মধ্যেও কূটনৈতিক তৎপরতা একেবারে থেমে নেই। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ইস্তাম্বুলে তুর্কি নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে জানিয়েছেন, আলোচনার পথ খোলা থাকলেও চাপ বা হুমকির মুখে ইরান কোনো আপস করবে না। বিশেষ করে দেশের প্রতিরক্ষা ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে কোনো ছাড় দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না বলে তিনি স্পষ্ট করেছেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও তুরস্কের মধ্যে গোপন যোগাযোগের মাধ্যমে যুদ্ধ এড়ানোর শেষ চেষ্টা চলছে। তবে একই সময়ে মার্কিন রণতরীগুলো ইরানের উপকূলের দিকে এগিয়ে আসায় পুরো মধ্যপ্রাচ্য যেন এক বিস্ফোরণপ্রবণ আগ্নেয়গিরির কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে।
প্রধান পক্ষগুলোর অবস্থান সংক্ষেপে
| পক্ষ | অবস্থান ও ঘোষণা |
|---|---|
| যুক্তরাষ্ট্র | সম্ভাব্য সামরিক অভিযান, নৌবহর অগ্রসর |
| ইরান | কঠোর পাল্টা জবাবের হুমকি, পূর্ণ প্রস্তুতি |
| ইসরাইল | হামলার পক্ষে, রেজিম চেঞ্জে সমর্থন |
| সৌদি আরব | আকাশসীমা ব্যবহারে অস্বীকৃতি |
| সংযুক্ত আরব আমিরাত | সামরিক অভিযানে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা |
বিশ্লেষকদের মতে, সামান্য ভুল সিদ্ধান্তই এই সংকটকে পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ দিতে পারে, যার প্রভাব বিশ্ব রাজনীতি ও জ্বালানি বাজার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে।
