বাংলাদেশে প্রসূতি সেবার ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান বিভাগের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা কেবল একটি চিকিৎসা সমস্যা নয়, বরং জাতীয় স্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে। আশুলিয়া উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন হসপিটালে করা সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, গত বছর আনুমানিক ১৭ লাখ শিশুর জন্ম সিজারিয়ানের মাধ্যমে হয়েছে, যেখানে এর কোনো চিকিৎসা প্রয়োজন ছিল না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) অনুযায়ী, সাধারণত জন্মের মাত্র ২১% ক্ষেত্রে সিজারিয়ান প্রয়োজনীয় হওয়া উচিত। কিন্তু বাংলাদেশে এই হার প্রায় ৫০%–এ পৌঁছেছে। বিশেষ করে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে পরিস্থিতি আরও গুরুতর, যেখানে প্রায় ৯টি শিশুর মধ্যে ৮টির জন্মই সার্জিক্যাল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
| জন্মের ধরন | WHO সুপারিশকৃত হার | বাংলাদেশে বর্তমান হার | বেসরকারি হাসপাতালে হার |
|---|---|---|---|
| সিজারিয়ান | 21% | ~50% | ~90% |
| স্বাভাবিক প্রসব | 79% | ~50% | ~10% |
এই উদ্বেগজনক প্রবণতার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। চিকিৎসকরা সময়সীমার চাপের মধ্যে থাকেন, বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতাল মালিকদের আর্থিক স্বার্থ কাজ করে, এবং প্রজননকালীন মায়েদের মধ্যে অনভিপ্রেত ভয় ছড়িয়ে পড়ে। স্বাভাবিক প্রসব দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া হলেও, অনেক হাসপাতাল ও চিকিৎসক সিজারিয়ানকে দ্রুত এবং সুবিধাজনক সমাধান হিসেবে প্রচার করেন। এছাড়া স্বাভাবিক জন্মকে ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যথাদায়ক হিসেবে উপস্থাপন করে পরিবার ও মায়ের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়, যার ফলে অনেকে অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন।
অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ানের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মারাত্মক। এটি মাতৃস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে এবং নবজাতকের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করতে পারে। অর্থনৈতিক দিক থেকেও, দেশের বাজেটে প্রতি বছর ৫০ বিলিয়ন টাকার বেশি অর্থ এই অপ্রয়োজনীয় প্রক্রিয়ায় ব্যয় হয়, যা মধ্য ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য অত্যধিক বোঝা সৃষ্টি করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধুমাত্র সচেতনতা বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়; কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ এখন জরুরি। বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের ওপর সরকারের তত্ত্বাবস্থা শক্ত করা, দক্ষ সহকারী মidadwife বৃদ্ধি এবং সরকারি হাসপাতালে স্বাভাবিক জন্মের সুযোগ সম্প্রসারণ এখন অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে হাসপাতাল জন্মের ৯০%ই চিকিৎসার কারণে নয়, বাণিজ্যিক কারণে নির্ধারিত হতে পারে, যা মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর হুমকি। এই বাণিজ্যিক চক্র ভাঙা এবং আসল মাতৃকল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া এখন জাতীয় জরুরি বিষয়।
