টাঙ্গাইল শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নারী চিকিৎসকদের ওয়াশরুমে ‘স্পাই ক্যামেরা’ বা গোপন ক্যামেরা স্থাপনের এক ন্যাক্কারজনক ঘটনায় অভিযুক্ত এক পুরুষ ইন্টার্ন চিকিৎসককে আটক করা হয়েছে। সোমবার (২৬ জানুয়ারি) বিকেলে তাকে গোয়েন্দা পুলিশ হেফাজতে নেয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে দিনভর উত্তেজনা ও চিকিৎসকদের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা কাজ করছে।
Table of Contents
ঘটনার সূত্রপাত ও লোমহর্ষক বর্ণনা
গত শনিবার (২৪ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় হাসপাতালের সার্জারি ইউনিট-১-এর ৯০৭ নম্বর কক্ষে দায়িত্বরত ছিলেন এক নারী ইন্টার্ন চিকিৎসক। কক্ষের সাথে সংযুক্ত ওয়াশরুমটি ব্যবহার করতে গিয়ে তিনি সেখানে একটি কলম সদৃশ স্পাই ক্যামেরা দেখতে পান। বিষয়টি বুঝতে পেরে তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে ক্যামেরাটি উদ্ধার করে নিজের কাছে রাখেন।
বিবৃতি অনুযায়ী, ক্যামেরাটি উদ্ধারের পর অভিযুক্ত পুরুষ ইন্টার্ন চিকিৎসক সেটি ফেরত পেতে ওই নারী চিকিৎসকের ওপর শারীরিক চড়াও হন। ক্যামেরাটি কেড়ে নেওয়ার চেষ্টায় ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে নারী চিকিৎসক হাতে আঘাত পান। পরবর্তীতে তিনি দ্রুত নিরাপদ স্থানে চলে যান এবং বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও তদন্তের সর্বশেষ অবস্থা:
| বিষয়ের বিবরণ | বিস্তারিত তথ্য ও অগ্রগতি |
| অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু | নারী চিকিৎসকদের ওয়াশরুমে লুক্কায়িত স্পাই ক্যামেরা। |
| অভিযুক্তের পরিচয় | টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজেরই একজন ইন্টার্ন চিকিৎসক। |
| তদন্ত কমিটি | ৫ সদস্যবিশিষ্ট উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। |
| কমিটির প্রধান | অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু হানিফ (সার্জারি বিভাগ)। |
| প্রশাসনিক দণ্ড | অভিযুক্তের ইন্টার্নশিপ সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা। |
| বর্তমান অবস্থা | অভিযুক্ত ব্যক্তি টাঙ্গাইল সদর থানা পুলিশের হেফাজতে। |
সন্দেহজনক পূর্বলক্ষণ ও পরিকল্পিত অপরাধ
লিখিত অভিযোগে ভুক্তভোগী নারী চিকিৎসক উল্লেখ করেছেন, অভিযুক্ত ব্যক্তির আচরণ অনেকদিন ধরেই সন্দেহজনক ছিল। নারী চিকিৎসকেরা ওয়াশরুম ব্যবহার করতে যাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে তিনি নিজে সেখানে প্রবেশ করতেন। প্রায়ই তিনি আগেভাগে ওয়াশরুমে ঢুকে সময় কাটাতেন, যা নারী সহকর্মীদের মধ্যে এক ধরণের অস্বস্তি তৈরি করেছিল। শনিবারের ঘটনার পর এটি পরিষ্কার হয় যে, তিনি পরিকল্পিতভাবে গোপন ভিডিও ধারণ করার উদ্দেশ্যে ওই স্থানে ক্যামেরা লুকিয়ে রাখতেন।
ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ও বিক্ষোভ
সোমবার অভিযুক্ত ইন্টার্ন চিকিৎসক তদন্ত কমিটির কাছে জবানবন্দি দিতে হাসপাতালে এলে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। খবর পেয়ে সাধারণ ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা কাজ ফেলে বেরিয়ে আসেন এবং অভিযুক্তের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা পুলিশের কাছ থেকে তাকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে এবং ক্ষোভ প্রকাশ করে।
পুলিশি তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া
টাঙ্গাইল সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রুহুল আমিন জানিয়েছেন, অভিযুক্ত ইন্টার্ন চিকিৎসক বর্তমানে পুলিশি হেফাজতে রয়েছেন। নারী চিকিৎসকের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ও মামলার প্রক্রিয়া চলমান। সাইবার অপরাধ ও নারী নিরাপত্তা আইনের আওতায় বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হচ্ছে। উদ্ধারকৃত স্পাই ক্যামেরাটি আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে এবং এতে কোনো ভিডিও সংরক্ষিত আছে কি না তা ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা হবে।
উপসংহার
হাসপাতালের মতো একটি সেবামূলক এবং সংবেদনশীল স্থানে চিকিৎসকদের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা ক্ষুণ্ণ হওয়ার এই ঘটনাটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এই ঘটনা কেবল টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ নয়, বরং সারাদেশের স্বাস্থ্যকর্মীদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। সাধারণ চিকিৎসকদের দাবি, তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করে অভিযুক্তের সনদ বাতিলসহ সর্বোচ্চ আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
