কারাফটকে স্ত্রী-সন্তানকে বিদায় জানানোর পর সাদ্দামের জামিন: ঘরে ফেরার বিষাদ

সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় অবশেষে উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন ছাত্রলীগের বাগেরহাট সদর উপজেলা শাখার সভাপতি জুয়েল হাসান ওরফে সাদ্দাম। সোমবার (২৬ জানুয়ারি, ২০২৬) হাইকোর্ট তাঁকে ছয় মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন প্রদান করেন। তবে এই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত মুক্তির সংবাদে সাদ্দামের পরিবারে কোনো উল্লাস নেই। কদিন আগেই কারাফটকের সামনে স্ত্রী ও ৯ মাসের শিশুপুত্রের নিথর দেহকে শেষ বিদায় জানানো সাদ্দামের কাছে এই মুক্তি এখন অর্থহীন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আইনি লড়াই ও আদালতের আদেশ

বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমদ ভূঞার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে সাদ্দামের জামিন আবেদনের ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে নিম্ন আদালতে কয়েক দফায় ব্যর্থ হওয়ার পর গত সপ্তাহে তাঁর আইনজীবীরা হাইকোর্টে আবেদন করেন। ইতিপূর্বে সাদ্দাম তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া অন্য ছয়টি মামলায় জামিন পেয়েছিলেন। আজকের এই আদেশের পর তাঁর কারামুক্তিতে আর কোনো আইনি বাধা নেই বলে জানিয়েছেন তাঁর আইনজীবীরা।

ঘটনার কালপঞ্জি ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাবলি:

সময়কালঘটনার বিবরণ
৫ এপ্রিল, ২০২৫গোপালগঞ্জ থেকে সাদ্দামকে গ্রেফতার করা হয়।
২৩ জানুয়ারি, ২০২৬সাদ্দামের স্ত্রী ও ৯ মাসের শিশুপুত্রের মরদেহ উদ্ধার।
২৪ জানুয়ারি, ২০২৬কারাফটকে স্ত্রী-সন্তানের লাশ দেখে শেষ বিদায় জানান সাদ্দাম।
২৬ জানুয়ারি, ২০২৬হাইকোর্ট থেকে ৬ মাসের অন্তবর্তীকালীন জামিন লাভ।
পারিবারিক অবস্থানসাবেকডাঙ্গা গ্রাম, বাগেরহাট সদর উপজেলা।
আবেদনের ধরণপ্যারোলে মুক্তির আবেদন নাকচ হওয়ার পর নিয়মিত জামিন লাভ।

“বাড়ি এসে তো দেখবে ছেলে-বউয়ের কবর”

সাদ্দামের জামিনের খবরটি যখন বাগেরহাটের সাবেকডাঙ্গা গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়, তখন সেখানে কেবল কান্নার শব্দ। সাদ্দামের মা দেলোয়ারা একরাম এক বুক হাহাকার নিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, “আগেও কয়েকবার জামিন হয়েছে কিন্তু বের হতে পারেনি। এখন জামিন হওয়া আর না হওয়া সমান কথা। ছেলেটা জেল থেকে বের হয়ে কার মুখ দেখবে? বাড়ির উঠোনে গেলেই তো দুইটা নতুন কবর তার চোখে পড়বে।”

সাদ্দামের শ্যালক শাহনেওয়াজ আমিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এই জামিন দিয়ে কী হবে? এ দেশে সব নাটকীয়তা। যখন প্রয়োজন ছিল, তখন প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়নি। এখন সব শেষ হয়ে যাওয়ার পর এই জামিনের কোনো মূল্য নেই।”

কারাফটকের ট্র্যাজেডি ও মানবাধিকার প্রশ্ন

গত ২৩ জানুয়ারি সাদ্দামের বাড়ি থেকে তাঁর স্ত্রী কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালী (২২) ও ৯ মাস বয়সী পুত্র নাজিফের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরদিন লাশবাহী ফ্রিজিং ভ্যানে করে তাঁদের মরদেহ যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকে নেওয়া হয়। জেলগেটের লোহার শিকের আড়াল থেকে স্ত্রী-সন্তানকে সাদ্দামের শেষ বিদায় জানানোর সেই দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। জানাজায় অংশ নেওয়ার জন্য সাদ্দামের পরিবার প্রশাসনের কাছে ‘প্যারোলে মুক্তি’র আবেদন জানালেও তা নামঞ্জুর করা হয়েছিল। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই বিষয়টিকে ‘চরম অমানবিক’ বলে আখ্যা দিয়েছে।

উপসংহার

সাদ্দাম হাসান ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে পলাতক ছিলেন এবং পরবর্তীতে গ্রেফতার হন। তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, ব্যক্তিগত জীবনের এই চরম বিপর্যয় তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে এক ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। জামিন নিয়ে কারাগার থেকে বের হলেও শূন্য ঘর আর প্রিয়জনদের সমাধিই হবে তাঁর নিত্যসঙ্গী। এই ঘটনাটি বন্দীদের মানবিক অধিকার এবং প্যারোলে মুক্তির আইনি সীমাবদ্ধতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।