আধিপত্য বিস্তার ও সেচ বিরোধে সালথায় রণক্ষেত্র, আহত ১০

ফরিদপুরের সালথা উপজেলায় পেঁয়াজ ক্ষেতে পানি সেচ দেওয়াকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে এক ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি, ২০২৬) দিবাগত রাতে উপজেলার গট্টি ইউনিয়নের বালিয়া গ্রামে এই সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। রাতের অন্ধকারে টর্চলাইট জ্বালিয়ে দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে দুই পক্ষ একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এই ঘটনায় উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন এবং বেশ কিছু বসতবাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাটের খবর পাওয়া গেছে।

বিরোধের নেপথ্য ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গট্টি ইউনিয়নের বালিয়া গ্রামে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে নুরু মাতুব্বর ও জাহিদ মাতুব্বরের মধ্যে দীর্ঘদিনের পুরনো শত্রুতা রয়েছে। বিবাদমান দুই নেতাই বিগত ১৭ বছর ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন। তবে গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে তারা খোলস পাল্টে বিএনপিতে যোগ দেন। মূলত এলাকায় একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে তারা ইতিপূর্বেও কয়েক দফা সহিংসতায় জড়িয়েছেন এবং আধিপত্যের এই দ্বন্দ্বে উভয়েই বিভিন্ন সময়ে জেল খেটেছেন।

সংঘর্ষ ও ক্ষয়ক্ষতির সংক্ষিপ্ত বিবরণ:

তথ্যের বিবরণবিস্তারিত তথ্য ও পরিসংখ্যান
সংঘর্ষের মূল কারণপেঁয়াজের জমিতে পানি সেচ নিয়ে বিতর্ক ও হাতাহাতি।
বিবাদমান পক্ষনুরু মাতুব্বর বনাম জাহিদ মাতুব্বর গ্রুপ।
আহতের সংখ্যা১০ জন (উভয় পক্ষ মিলিয়ে)।
ক্ষয়ক্ষতির ধরণ৫টি বসতবাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও মালামাল লুটপাট।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকাসেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ।
বর্তমান পরিস্থিতিএলাকায় পুলিশ মোতায়েন ও থমথমে অবস্থা বিরাজমান।

ঘটনার সূত্রপাত ও সংঘর্ষের বিবরণ

ঘটনার শুরু হয় বৃহস্পতিবার বিকেলে, যখন বালিয়া গ্রামের মাঠে পেঁয়াজ ক্ষেতে পানি দেওয়া নিয়ে জাহিদ মাতুব্বরের সমর্থক মো. শহীদ শরীফের সঙ্গে নুরু মাতুব্বরের সমর্থক জাহিদ শরীফের কথা কাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে এটি হাতাহাতি ও মারামারিতে রূপ নেয়। এই ঘটনার জের ধরে সন্ধ্যায় বালিয়া বাজারে উভয় পক্ষের সমর্থকরা দেশীয় অস্ত্রসহ জড়ো হতে শুরু করেন।

রাত সাড়ে ৮টার দিকে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। রাতের অন্ধকারের কারণে উভয় পক্ষ হাতে টর্চলাইট নিয়ে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় লিপ্ত হয়। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী চলা এই তান্ডবে ৫টি বসতবাড়িতে হামলা চালিয়ে আসবাবপত্র ভাঙচুর ও মূল্যবান মালামাল লুট করা হয়। আর্তচিৎকার ও টর্চলাইটের আলোর ঝলকানিতে পুরো গ্রামে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

হতাহত ও চিকিৎসা ব্যবস্থা

সংঘর্ষে আহত ১০ জনের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাঁদের দ্রুত ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বাকিদের স্থানীয় পর্যায়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। সংঘর্ষের খবর পেয়ে সালথা আর্মি ক্যাম্পের সেনাসদস্য ও সালথা থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তাঁদের উপস্থিতিতে হামলাকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যায় এবং দীর্ঘ প্রচেষ্টায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

প্রশাসনের বক্তব্য

সালথা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. বাবলুর রহমান খান জানান, “পেঁয়াজের জমিতে সেচ দেওয়া নিয়ে তুচ্ছ ঘটনার জেরে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত। সেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ প্রচেষ্টায় বর্তমানে এলাকার পরিবেশ শান্ত রয়েছে। তবে নতুন করে যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সেজন্য গ্রামে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। অপরাধীদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে।”

উপসংহার

গ্রামীণ জনপদে তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে এমন সহিংসতা এবং রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তনের মাধ্যমে আধিপত্য টিকিয়ে রাখার চেষ্টা জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে পুলিশ প্রশাসন প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এবং এলাকায় স্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনবে।