শিশুর স্বাস্থ্যের ঝুঁকি  গুঁড়া দুধে ৬৭ শতাংশ ভেজাল

মিরপুরের খলিলুর রহমানের মতো অনেক বাবা-মা সন্তানদের জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর খাবার কিনতে সচেষ্ট থাকেন। মুদি দোকান থাকা সত্ত্বেও তিনি ডিপার্টমেন্ট স্টোর থেকে একটু বেশি দামের ব্র্যান্ডেড খাদ্যদ্রব্য কেনেন। পরীবাগের বাসিন্দা সালেহা চৌধুরীর কথাও একই রকম—“দাম কিছুটা বেশি হলেও শিশুর জন্য ভালো পণ্য কেনাই নিরাপদ।”

কিন্তু সম্প্রতি ধীরে ধীরে প্রকাশিত হয়েছে শোচনীয় সত্যি—বাজারে অনেক ‘ভালো ব্র্যান্ডের’ শিশুখাদ্যও ভেজাল উপাদান দিয়ে তৈরি। শিশুদের প্রিয় গুঁড়া দুধের মধ্যে ‘হয়ে পাউডার’ মেশানো হচ্ছে, যা মূলত সাদা রঙের ক্ষতিকর পাউডার। ল্যাব পরীক্ষায় দেখা গেছে, এক পরিচিত ব্র্যান্ড “গোয়ালিনী ডেইলি ফুলক্রিম মিল্ক পাউডার”-এ মাত্র ১৭ শতাংশই দুগ্ধ উপাদান, বাকি ৬৭ শতাংশ বা তার বেশি ভেজাল।

সরকারি অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সস্তা ভেজাল উপাদান ব্যবহার করে চকচকে প্যাকেজে এই পণ্য বাজারজাত করা হচ্ছে। আইনের শাসন থাকা সত্ত্বেও অপরাধীরা সামান্য শাস্তিতেই মুক্তি পাচ্ছে। ক্রেতা বুঝতে পারছেন না যে তারা তাদের সন্তানকে ভেজাল খাদ্য খাইয়ে দিচ্ছেন।

নিচের টেবিলে কিছু প্রমাণিত ভেজাল গুঁড়া দুধের বিশদ উপাদান তুলে ধরা হলো:

পণ্যপ্রত্যাশিত দুগ্ধ উপাদান (%)পরীক্ষায় পাওয়া দুগ্ধ উপাদান (%)ভেজাল উপাদান (%)রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য পার্থক্য
গোয়ালিনী ফুলক্রিম মিল্ক7617.0867.44চর্বি: 42% → 7.58%, প্রোটিন: 34% → 9.5%
আসলাম টি ফুল ক্রিমল্যাব উত্তীর্ণ হয়নি
ডানো ফুল ক্রিম মিল্কল্যাব উত্তীর্ণ হয়নি
ড্যানিশ ফুল ক্রিম মিল্কল্যাব উত্তীর্ণ হয়নি
নেসলে ইনস্ট্যান্ট মিল্কল্যাব উত্তীর্ণ হয়নি
স্টারশিপ গুঁড়া দুধল্যাব উত্তীর্ণ হয়নি

গবেষকরা বলছেন, এসব পণ্যের উপর সরকারী তদারকি সীমিত। বিএসটিআই লোগো থাকলেও অনেক সময় তা নকল। আইন অনুযায়ী, শিশুখাদ্য, গুঁড়া দুধ, চকলেট ও বিস্কুটে বিএসটিআই অনুমোদন বাধ্যতামূলক। বিএসটিআই সমন্বয় কর্মকর্তা মো. তৌহিদুর রহমান বলেন, “কিউআর কোড স্ক্যান করলে গ্রাহক নিশ্চিত হতে পারবেন পণ্য নিবন্ধিত কি না।”

এছাড়া, পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে আমদানি করা কিটক্যাট চকলেট ও কোকোলা ওয়েফারেও ভেজাল ধরা পড়েছে। শিশুদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি উল্লেখ করে জাতীয় পুষ্টি পরিষদের ডা. মো. আকতার ইমাম বলেন, “ভেজাল পণ্য কিডনি ও মস্তিষ্কের বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে, শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হতে পারে।”

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জাকারিয়া বলেন, “বাজার থেকে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার মাধ্যমে আমরা চেষ্টা করছি শিশুখাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণে রাখার। সন্দেহজনক পণ্য সম্পর্কে জনগণ প্রশাসনকে জানালে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।”

শিশুখাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে আইন প্রয়োগ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বাজারে নিয়মিত পরীক্ষা একান্ত প্রয়োজন। ভেজাল পণ্য প্রতিরোধ না হলে শিশুর স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা দীর্ঘমেয়াদে হুমকির মুখে থাকবে।