সতীর্থদের কাঁধে ভর করে দুই হাত আকাশে মেলে ধরেছেন সাদিও মানে। এক হাতে সোনালি ট্রফি, অন্য হাতে বিজয়ের দৃঢ় মুষ্টি। মুখজুড়ে প্রশান্ত, তৃপ্ত সেই হাসি—যেন নিঃশব্দে ঘোষণা দিচ্ছে, আফ্রিকার সিংহাসনে এখন তাঁরই অধিকার। দ্বিতীয়বারের মতো আফ্রিকা কাপ অব নেশনস জিতে আবারও নিজেকে প্রমাণ করলেন সেনেগালের এই মহাতারকা। আলোঝলমলে এই দৃশ্য শুধু একটি ট্রফি জয়ের উদ্যাপন নয়, বরং দীর্ঘদিনের এক বিতর্কেরও স্পষ্ট জবাব—আফ্রিকার আসল রাজা কে?
এই উদ্যাপনের খবর কি মোহাম্মদ সালাহ দেখেছেন? না দেখলেও খবর নিশ্চয়ই তাঁর কানে পৌঁছেছে। এক সময়ের ক্লাব সতীর্থ, আক্রমণভাগের অবিচ্ছেদ্য অংশ মানের এই সাফল্য হয়তো সালাহর মনে দ্বৈত অনুভূতির জন্ম দিয়েছে—একদিকে গর্ব, অন্যদিকে অপূর্ণতার চাপা দীর্ঘশ্বাস।
লিভারপুলের সেই স্বর্ণালি অধ্যায় এখনো ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল। ২০১৭ সালে সালাহ যখন রোমা থেকে অ্যানফিল্ডে যোগ দেন, মানে সেখানে আছেন তার আগের মৌসুম থেকেই। ইয়ুর্গেন ক্লপের হাত ধরে এই দুই আফ্রিকান তারকাই লিভারপুলকে ফিরিয়ে এনেছিলেন ইউরোপের অভিজাত মঞ্চে। ২০১৮-১৯ মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগ জয় এবং পরের মৌসুমে ৩০ বছর পর প্রিমিয়ার লিগ—সবকিছুর পেছনেই ছিল সালাহ–মানে জুটির দুর্দান্ত রসায়ন।
তবে ক্লাব ফুটবলে আলোটা বেশির ভাগ সময়ই পড়েছে সালাহর দিকেই। গোল, রেকর্ড আর ব্যক্তিগত পুরস্কারে ‘মিসরীয় রাজপুত্র’ এগিয়ে ছিলেন অনেকখানি। প্রিমিয়ার লিগ ইতিহাসে আফ্রিকান ফুটবলার হিসেবে সর্বোচ্চ গোলদাতাও তিনি। কিন্তু জাতীয় দলের মঞ্চে এসে ছবিটা পুরোপুরি বদলে যায়।
২০২২ সালে সালাহর ছায়া থেকে বেরিয়ে নিজের আলাদা পরিচয় গড়তেই লিভারপুল ছাড়েন মানে। বায়ার্ন মিউনিখ হয়ে বর্তমানে তিনি খেলছেন সৌদি আরবের আল নাসরে, যেখানে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর উপস্থিতিতে খানিকটা আড়ালেই আছেন। বিপরীতে সালাহ এখনো লিভারপুলের জার্সিতে গোলের পর গোল করে চলেছেন।
কিন্তু রেকর্ডের পাহাড়ের পাশেই মানে বসিয়ে দিয়েছেন এমন এক অনড় স্তম্ভ, যা সালাহ এখনো স্পর্শ করতে পারেননি—আফ্রিকা কাপ অব নেশনস।
আফকনে মানে বনাম সালাহ: সংক্ষিপ্ত তুলনা
| বিষয় | সাদিও মানে | মোহাম্মদ সালাহ |
|---|---|---|
| আফকন শিরোপা | ২ বার (২০২১, ২০২5*) | ০ |
| ফাইনাল/নকআউটে মুখোমুখি | ২ বার জয় | ২ বার পরাজয় |
| টুর্নামেন্ট সেরা | ২ বার | ০ |
| বয়স (২০২৬ অনুযায়ী) | ৩৩ | ৩৩ |
*ধরা হয়েছে সাম্প্রতিক আসরের ভিত্তিতে
২০২১ সালের ফাইনালে টাইব্রেকারে সালাহর মিসরকে হারিয়ে প্রথমবার আফকন জেতেন মানে। আর সর্বশেষ আসরে সেমিফাইনালেই সালাহকে বিদায় করে ফাইনালে শিরোপা নিশ্চিত করেন। দুইবারই টুর্নামেন্ট সেরা হয়ে প্রমাণ করেছেন—বড় ম্যাচের বড় খেলোয়াড় তিনি।
২০২৭ সালের আফকনে সালাহর বয়স হবে ৩৫। ফিটনেস, দলীয় ভারসাম্য ও ভাগ্য—সব মিললে হয়তো তখনও সুযোগ থাকবে। কিন্তু ততদিনে মানে চাইলে ব্যবধান আরও বাড়িয়ে নিতে পারেন। কারণ বয়সের দিক থেকে তাঁর অবস্থানও একই।
সব হিসাব-নিকাশ ছাপিয়ে আপাতত একটাই সত্য—জাতীয় দলের সাফল্যের মঞ্চে সাদিও মানেই এখন আফ্রিকার অবিসংবাদিত রাজা। সালাহ রেকর্ডের রাজা হতে পারেন, কিন্তু শিরোপার মুকুটটা এখনো মানের মাথাতেই সবচেয়ে মানায়।
