সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গতকাল রাত থেকেই ঘুরে বেড়াচ্ছে একটি কোলাজ ছবি। দুটি ছবি, দুটি মুহূর্ত, কিন্তু অবিকল একই ভঙ্গি। দুজন গোলকিপার দুই পা ছড়িয়ে, শরীর ঝুঁকিয়ে, শেষ আশ্রয় হিসেবে নিজেদের অদম্য রিফ্লেক্সকে সামনে এনে বল ঠেকাচ্ছেন। একজন মরক্কোর নির্ভরতার নাম ইয়াসিন বুনু, অন্যজন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী নায়ক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ।
দুজন দুই মহাদেশের মানুষ, খেলেন ভিন্ন ভিন্ন টুর্নামেন্টে। তবু আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের ফাইনাল যেন সময়ের সীমানা মুছে এনে তাঁদের একই ফ্রেমে বন্দী করে ফেলেছে।
রাবাতে অনুষ্ঠিত আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের ফাইনালে সেনেগালের বিপক্ষে ম্যাচের ৩৭ মিনিটে বুনু যে সেভটি করেন, তা দেখেই ফুটবলপ্রেমীদের মনে পড়ে যায় ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ ফাইনালের সেই অবিস্মরণীয় মুহূর্ত। ঠিক যেমনটা করেছিলেন এমিলিয়ানো মার্তিনেজ—মরণবাঁচন শটের সামনে নিজের শরীরকে শেষ দেয়াল বানিয়ে।
অবশ্য পার্থক্যও আছে। মার্তিনেজ বল ঠেকিয়েছিলেন বাঁ পায়ে, বুনু ডান পায়ে। সময়ও আলাদা—একজন অতিরিক্ত সময়ের অন্তিম মুহূর্তে, অন্যজন ম্যাচের প্রথমার্ধে। কিন্তু সেভের কৌশল, শরীরের ভারসাম্য, প্রতিপক্ষের শটের কোণ সংকুচিত করার দক্ষতা—সব মিলিয়ে এটি যেন ‘কার্বন কপি’।
সেই ঐতিহাসিক মার্তিনেজ সেভ
২০২২ বিশ্বকাপ ফাইনালে ফ্রান্সের ফরোয়ার্ড রঁদাল কোলো মুয়ানি যখন একা পেয়ে যান মার্তিনেজকে, তখন মনে হচ্ছিল ট্রফি বুঝি ফ্রান্সের হাতেই যাচ্ছে। কিন্তু মার্তিনেজের বাঁ পায়ের অবিশ্বাস্য রিফ্লেক্স শুধু গোলই বাঁচায়নি, বদলে দিয়েছিল ইতিহাস। সেই সেভের ফলেই ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে, আর শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা ওঠে বিশ্বসেরার মুকুটে।
বুনুর গল্পটা ভিন্ন, তবু মহিমান্বিত
বুনুর ক্ষেত্রে ভাগ্য এতটা সহায় হয়নি। নির্ধারিত সময় ও অতিরিক্ত সময় মিলিয়ে একাধিক দুর্দান্ত সেভ করেও শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ের চতুর্থ মিনিটে হজম করা গোলেই শিরোপা হারায় মরক্কো। তবে বাস্তবতা হলো—বুনু যদি ম্যাচের ৩৭ মিনিটে সেনেগালের ইলিমান এনদিয়ায়ের সেই নিশ্চিত গোল ঠেকাতে না পারতেন, ম্যাচ হয়তো অনেক আগেই শেষ হয়ে যেত।
ইলিমান যখন বক্সের ডান পাশে একা হয়ে যান, তখন বুনু সামনে এগিয়ে গিয়ে শটের জায়গা কমান। ঠিক মার্তিনেজের মতোই দুই পা ও দুই হাত ছড়িয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন বলের সামনে। মুহূর্তটিই জন্ম দেয় তুলনার।
ফুটবল ইতিহাসে ‘পুনরাবৃত্তির’ নজির
ফুটবল ইতিহাসে এমন পুনরাবৃত্তি নতুন নয়। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ডিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ ও অবিশ্বাস্য ড্রিবলিং গোলের ছায়া আমরা দেখেছি লিওনেল মেসির ক্যারিয়ারেও। ২০০৭ সালে হেতাফের বিপক্ষে ম্যারাডোনার মতোই কয়েকজনকে কাটিয়ে গোল, আবার এস্পানিওলের বিপক্ষে হাত দিয়ে গোল—দুটিই তখন ‘কার্বন কপি’ ও ‘নতুন হ্যান্ড অব গড’ নামে পরিচিত হয়েছিল।
তাহলে কি এটাই ‘লেগ অব গড’?
প্রশ্ন উঠছেই—বুনু কি তবে মার্তিনেজের ‘লেগ অব গড’ ফিরিয়ে আনলেন? ইতিহাস কী নামে এই সেভকে মনে রাখবে, তা ঠিক করবে সময় ও স্মৃতি।
তবে শিরোপা জিততে না পারলেও ব্যক্তিগত অর্জনে বুনুর হাসি ছিল স্বাভাবিক।
ইয়াসিন বুনু: আফ্রিকা কাপ অব নেশনস ২০২৫ (সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান)
| সূচক | সংখ্যা |
|---|---|
| ম্যাচ | ৭ |
| ক্লিন শিট | ৫ |
| হজম করা গোল | ৩ |
| সেরা গোলকিপার পুরস্কার | ✔ |
সাত ম্যাচে পাঁচটি ক্লিন শিট—এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, ট্রফি না এলেও আফ্রিকার সেরা গোলকিপার হিসেবে বুনু নিজের জায়গা ঠিকই পাকা করে নিয়েছেন।
