আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে বর্তমানে এক গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ভারতের মাটিতে অনুষ্ঠিতব্য এই টুর্নামেন্টে নিরাপত্তার অজুহাতে বাংলাদেশ দল পাঠাতে সরকার ও বিসিবির অনড় অবস্থান এখন পর্যন্ত স্পষ্ট। এই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বিসিবির অর্থ কমিটির প্রধান এম নাজমুল ইসলাম আজ বোর্ড ও ক্রিকেটারদের আর্থিক লাভ-ক্ষতি এবং ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্স নিয়ে কিছু রূঢ় ও বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন, যা ক্রীড়াঙ্গনে আলোচনার ঝড় তুলেছে।
বিসিবির আর্থিক সুরক্ষা ও আইসিসি রাজস্ব
প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে আয়োজিত এক দোয়া মাহফিল শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে নাজমুল ইসলাম নিশ্চিত করেন যে, বিশ্বকাপে অংশ না নিলেও বিসিবির কোনো আর্থিক ক্ষতি হবে না। আইসিসির বর্তমান কাঠামো অনুযায়ী, ২০২৭ সাল পর্যন্ত বিসিবির রাজস্ব আয়ের ধারা অপরিবর্তিত থাকবে।
আইসিসি থেকে বিসিবির প্রাপ্ত অর্থের একটি আনুমানিক হিসাব নিচে দেওয়া হলো:
| খাতের নাম | অর্থের পরিমাণ (বার্ষিক/এককালীন) | বাংলাদেশি মুদ্রায় (প্রায়) |
| আইসিসি বার্ষিক রিভিনিউ | ২০.৪ মিলিয়ন ডলার | ২৪৫ কোটি টাকা |
| আইসিসি রিজার্ভ ফান্ড | ৪ মিলিয়ন ডলার (প্রতি ৪ বছরে) | ৪৮ কোটি টাকা |
| বিশ্বকাপ প্রস্তুতি অনুদান | ৫ লক্ষ ডলার (এককালীন) | ৬ কোটি টাকার বেশি |
| বিগত বিশ্বকাপের প্রাইজমানি | ৭ লক্ষ ২০ হাজার ডলার | ৮.৬ কোটি টাকা (প্রায়) |
বিসিবি ইতিমধ্যে বিশ্বকাপের প্রস্তুতি ফি বাবদ ৬ কোটি টাকার বেশি বুঝে পেয়েছে। ফলে টুর্নামেন্ট বর্জন করলেও বোর্ডের কোষাগারে কোনো টান পড়বে না।
ক্রিকেটারদের আর্থিক ক্ষতি ও পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন
বোর্ডের ক্ষতি না হলেও নাজমুল ইসলাম স্পষ্ট করেছেন যে, ব্যক্তিগতভাবে ক্রিকেটাররা চরম আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবেন। বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করলে প্রতিটি ম্যাচের জন্য প্রাপ্ত নির্ধারিত ‘ম্যাচ ফি’ এবং টুর্নামেন্টের ফলাফল অনুযায়ী প্রাইজমানি থেকে তারা বঞ্চিত হবেন। তবে এই ক্ষতি বোর্ড পুষিয়ে দেবে কি না, এমন প্রশ্নে তিনি ক্রিকেটারদের যোগ্যতা ও বিনিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
নাজমুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ওরা গিয়ে যদি কিছুই না করতে পারে, তবে ওদের পেছনে আমরা যে কোটি কোটি টাকা খরচ করছি, তা কি ফেরত চাচ্ছি?” তিনি আরও যোগ করেন যে, বড় কোনো বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ দল আজ পর্যন্ত কোনো বড় সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। বারবার ব্যর্থ হওয়া ক্রিকেটারদের পেছনে বিনিয়োগের বিপরীতে কোনো ‘রিটার্ন’ না পাওয়ায় তিনি এই কঠোর মনোভাব ব্যক্ত করেন।
বোর্ড ও ক্রিকেটার: কে কার পরিপূরক?
বিসিবির এই শীর্ষ কর্মকর্তার বক্তব্যে ক্রিকেটারদের প্রতি এক ধরণের অবজ্ঞার সুর ফুটে উঠেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। যদিও তিনি দাবি করেছেন যে ক্রিকেটার ও বোর্ড একে অপরের ‘পার্ট অ্যান্ড পার্সেল’ বা অবিচ্ছেদ্য অংশ, তবুও তার বক্তব্যে বোর্ডকেই শ্রেষ্ঠতর অবস্থানে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। তার মতে, “বোর্ড না থাকলে ক্রিকেটাররা থাকবে কি না”—এমন প্রশ্ন তোলাটাই স্বাভাবিক।
তবে বাস্তবতা হলো, ক্রিকেটারদের মাঠের লড়াই এবং জনপ্রিয়তাকে কেন্দ্র করেই আইসিসি ও বড় বড় পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠানগুলো বিসিবিকে কোটি কোটি টাকা প্রদান করে। খেলোয়াড়দের পেছনে করা খরচকে ‘খোঁটা’ হিসেবে উপস্থাপন করা একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার কাছ থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দেশের স্বার্থ ও নিরাপত্তার প্রশ্নে বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত যৌক্তিক হলেও, মাঠের সৈনিকদের পারফরম্যান্স নিয়ে এমন প্রকাশ্য কটূক্তি বাংলাদেশের ক্রিকেটের অভ্যন্তরীণ ফাটলকেই যেন সামনে নিয়ে এল।
