হামলা ও অগ্নিসংযোগে বিধ্বস্ত উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পুড়ে যাওয়া সাংস্কৃতিক সম্পদের ধ্বংসস্তূপ প্রদর্শনীর মাধ্যমে সংগঠনটি তাদের ৫৭ বছরের সংগ্রামী সাংস্কৃতিক ইতিহাস নতুন করে জনগণের সামনে তুলে ধরেছে। বাদ্যযন্ত্র, নাটকের কস্টিউম, প্রপস, গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ও স্মারক—সবকিছুই ছিল এই প্রদর্শনীর অংশ, যা একদিকে যেমন ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তুলে ধরে, অন্যদিকে তেমনি বাংলাদেশের প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ওপর চলমান আঘাতের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
মঙ্গলবার ঢাকায় উদীচীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত এই প্রদর্শনী ও সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের নেতারা অভিযোগ করেন, নৃশংস এই হামলার ২৪ দিন পেরিয়ে গেলেও অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি এখনো খোঁজ নেননি। ন্যূনতম সহানুভূতি বা আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়াও পাওয়া যায়নি বলে জানান উদীচীর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হাবিবুল আলম ও সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার।
লিখিত বক্তব্যে জামসেদ আনোয়ার বলেন, দেশের অন্যতম বৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী গণভিত্তিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের ওপর এমন আক্রমণের পর সংস্কৃতি উপদেষ্টার নির্লিপ্ত ভূমিকা গভীর উদ্বেগ ও প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। তাঁর ভাষায়, এই হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং স্বাধীনতাবিরোধী, উগ্র সাম্প্রদায়িক ও ফ্যাসিবাদী শক্তির সুপরিকল্পিত আক্রমণ। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর ছায়ানট, প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের ওপর হামলার পরদিনই উদীচী কার্যালয়ে হামলার ঘটনা ঘটায়, যা ধারাবাহিকতার প্রমাণ বহন করে।
তিনি আরও বলেন, প্রকাশ্য সমাবেশে ছাত্রশিবির নেতাদের দেওয়া হুমকির বিষয়টি সবার জানা থাকলেও কার্যকর কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং সরকারের নিস্পৃহতা এই বর্বরতার পথ প্রশস্ত করেছে। হামলার দিন নিরাপত্তা চেয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও পুলিশি সহায়তা পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে উদীচীর পক্ষ থেকে ক্ষয়ক্ষতির একটি সংক্ষিপ্ত চিত্রও তুলে ধরা হয়:
| ক্ষতিগ্রস্ত বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| সাংস্কৃতিক নথি | ৫৭ বছরের দলিল, ছবি ও আর্কাইভ |
| বাদ্যযন্ত্র | ঢোল, তবলা, হারমোনিয়ামসহ বহু যন্ত্র |
| নাট্য সামগ্রী | কস্টিউম, প্রপস, মঞ্চসজ্জা |
| আর্থিক ক্ষতি | উল্লেখযোগ্য, পুনর্গঠন প্রয়োজন |
হাবিবুল আলম জানান, হামলার ঘটনায় মামলা করা হয়েছে এবং পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস আলামত সংগ্রহ ও প্রাথমিক তদন্ত শেষ করেছে। তবে এখনো কোনো আসামি শনাক্ত বা গ্রেপ্তার হয়নি। দ্রুত হামলাকারীদের গ্রেপ্তার না হলে সাংস্কৃতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
এদিকে ধ্বংসস্তূপ পরিদর্শন শেষে সিপিবির সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, এমন গন্ধ ও অনুভূতি তিনি শেষবার পেয়েছিলেন ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসে। তাঁর মতে, সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের ওপর আক্রমণকারীরা কখনোই বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি নয়।
সংবাদ সম্মেলন ও প্রদর্শনীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। শেষে সম্মিলিত কণ্ঠে সংগীত পরিবেশন করেন উদীচীর শিল্পীরা—যা ধ্বংসের মধ্যেও প্রতিরোধ ও সাংস্কৃতিক চেতনার অবিনাশী শক্তির বার্তা বহন করে।
