উচ্চশিক্ষার অন্যতম প্রধান গন্তব্য অস্ট্রেলিয়ায় দক্ষিণ এশিয়ার শিক্ষার্থীদের জন্য ভিসা প্রাপ্তির পথ এখন থেকে আরও বন্ধুর হতে চলেছে। নথিপত্র সংক্রান্ত স্বচ্ছতার অভাব এবং ক্রমবর্ধমান জালিয়াতির আশঙ্কায় বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানের শিক্ষার্থীদের জন্য ভিসা যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া অত্যন্ত কঠোর করেছে দেশটির সরকার। গত ৮ জানুয়ারি অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিশেষ ঘোষণায় এই চারটি দেশকে ‘এভিডেন্স লেভেল ২’ থেকে নামিয়ে ‘এভিডেন্স লেভেল ৩’ বা সর্বোচ্চ ঝুঁকির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে।
কাঠামোগত পরিবর্তন ও ঝুঁকির কারণ
অস্ট্রেলিয়ার সিম্পলিফাইড স্টুডেন্ট ভিসা ফ্রেমওয়ার্ক (SSVF) মূলত জালিয়াতির হার, ভিসা প্রত্যাখ্যানের সংখ্যা এবং স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে গিয়ে অবৈধভাবে বসবাসের প্রবণতার ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন দেশের রেটিং নির্ধারণ করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই চার দেশ থেকে আসা শিক্ষার্থীদের নথিপত্রে অসামঞ্জস্যতা এবং ভুয়া তথ্যের আধিক্য পরিলক্ষিত হওয়ায় এই কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষ করে গত বছরের শেষ ভাগে ভারত ও বাংলাদেশে বড় আকারের জাল ডিগ্রি এবং ভুয়া ব্যাংক গ্যারান্টি চক্রের তথ্য ফাঁস হওয়ার বিষয়টি এই পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করেছে।
নতুন এই নিয়মের ফলে ভিসা আবেদন প্রক্রিয়ায় যে পরিবর্তনগুলো আসবে, তা নিচের সারণিতে বিস্তারিত দেওয়া হলো:
অস্ট্রেলীয় স্টুডেন্ট ভিসা: নতুন কড়াকড়ি ও প্রয়োজনীয়তা
| বিষয়ের ক্ষেত্র | পূর্ববর্তী অবস্থা (EL-2) | বর্তমান অবস্থা (EL-3) |
| ঝুঁকির শ্রেণীবিভাগ | মাঝারি মানের ঝুঁকি। | উচ্চ বা সর্বোচ্চ ঝুঁকি। |
| আর্থিক সক্ষমতা | অনেক ক্ষেত্রে নথিপত্র শিথিল ছিল। | অন্তত ৩ মাসের ব্যাংক স্টেটমেন্ট বাধ্যতামূলক। |
| তহবিলের উৎস | সাধারণ ঘোষণা গ্রহণযোগ্য ছিল। | অর্থের উৎসের বিস্তারিত ও বৈধ প্রমাণ প্রয়োজন। |
| সনদ যাচাই | শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যায়ে যাচাই। | ইন্টারপোল ও স্পট চেকের মাধ্যমে উচ্চতর যাচাই। |
| আবেদনের ধরণ | সহজতর প্রক্রিয়া। | অতিরিক্ত নথিপত্রসহ নিবিড় পর্যবেক্ষণ। |
অতিরিক্ত নথিপত্রের বোঝা ও কঠোর নজরদারি
‘এভিডেন্স লেভেল ৩’ রেটিংয়ের অর্থ হলো, এখন থেকে আবেদনকারী শিক্ষার্থী এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আর্থিক স্বচ্ছতা ও শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে আরও সূক্ষ্ম ও বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করতে হবে। ওয়াশিংটনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘ভিসা এইচকিউ’র তথ্যমতে, আবেদনকারীদের এখন থেকে শুধু ব্যাংক স্টেটমেন্ট দিলেই হবে না, বরং সেই অর্থের উৎস সম্পর্কে অকাট্য প্রমাণ দিতে হবে। পাশাপাশি, জালিয়াতি রোধে বায়োমেট্রিক তথ্য যাচাইয়ে ইন্টারপোলের সহায়তা নেওয়া হবে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আকস্মিক যাচাই-বাছাই বা ‘স্পট চেক’ করবে।
সিদ্ধান্তের নেপথ্যে ভারতের জাল সনদ কেলেঙ্কারি
অস্ট্রেলীয় কর্মকর্তাদের মতে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে রেকর্ড সংখ্যক ভিসা আবেদনের সময় ভুয়া ডিগ্রি এবং ব্যাংক গ্যারান্টি ধরা পড়ে। ভারতের একটি অভিযানে ১ হাজার ২০০টি জাল স্নাতক সনদ জব্দের ঘটনাটি অস্ট্রেলীয় নীতিনির্ধারকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। আন্তর্জাতিক শিক্ষাবিষয়ক সহকারী মন্ত্রী জুলিয়ান হিল সম্প্রতি দক্ষিণ এশিয়া সফর করে এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেন।
শিক্ষার্থীদের ওপর প্রভাব ও সরকারি ভাষ্য
অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন যে, এই পদক্ষেপটি মূলত প্রকৃত শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষার জন্য নেওয়া হয়েছে। সরকার চায় না কোনো শিক্ষার্থী ভুয়া তথ্য দিয়ে প্রতারিত হোক বা নিম্নমানের শিক্ষার জন্য বিনিয়োগ করুক। তবে এই কড়াকড়ির ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভিসা প্রসেসিং সময় আগের চেয়ে বৃদ্ধি পাবে এবং নথিপত্রে সামান্যতম ভুল থাকলেও সরাসরি ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যাবে।
