সুনামগঞ্জের তাহিরপুর সীমান্তে রূপার নূপুর চুরির ভিত্তিহীন অপবাদে এক পিতৃহীন কিশোরকে দোকানঘরে আটকে রেখে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতনের ঘটনায় আরও এক আসামিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতারকৃত আসামির নাম তরিকুল ইসলাম, যে এই মামলার প্রধান আসামি আমির উদ্দিনের ছেলে। গত বৃহস্পতিবার তাকে সুনামগঞ্জ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সোপর্দ করা হলে বিচারক জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এর আগে মামলার প্রধান আসামি আমির উদ্দিনকেও পুলিশ গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠিয়েছে।
বর্বরোচিত নির্যাতনের রোমহর্ষক বর্ণনা
ঘটনার সূত্রপাত হয় প্রধান আসামি আমির উদ্দিনের শিশু কন্যার একটি রূপার নূপুর হারিয়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে। এই চুরির অপবাদ দেওয়া হয় স্থানীয় কিশোর হাফিজ উদ্দিনের ওপর, যে কি না জাদুকাটা নদীতে পাথর ও লাকড়ি কুড়িয়ে অতি কষ্টে তার পরিবারের ভরণপোষণ করত। গত ২৯ ডিসেম্বর সোমবার সন্ধ্যায়, আমির ও তার সহযোগীরা হাফিজকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে লাউড়গড় বাজারের একটি নির্জন দোকানের ভেতর হাত-পা বেঁধে ফেলে। এরপর চুরির স্বীকারোক্তি আদায়ে তার ওপর চালানো হয় অবর্ণনীয় শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন। পাষণ্ডরা হাফিজের হাত ও পায়ের নখের ভেতর সুই ঢুকিয়ে দেয় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে প্লাস দিয়ে চেপে পৈশাচিক আনন্দ উপভোগ করে। যন্ত্রণায় কিশোরটি দুবার জ্ঞান হারিয়ে ফেললে তার ক্ষতস্থানে ফ্রিজের বরফশীতল পানি ঢেলে পুনরায় নির্যাতন চালানো হয়।
ঘটনার প্রধান তথ্যসমূহ এবং আইনি পদক্ষেপের বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
তাহিরপুর কিশোর নির্যাতন মামলা: বর্তমান চিত্র ও আইনি তথ্য
| বিষয়ের ক্ষেত্র | বিস্তারিত বিবরণ ও তথ্য |
| নির্যাতিত কিশোর | হাফিজ উদ্দিন (পিতৃহীন), পেশা: পাথর ও লাকড়ি কুড়ানো। |
| মূল অভিযুক্তগণ | আমির উদ্দিন, তরিকুল ইসলাম, সফিকুল ও রাকিব। |
| নির্যাতনের প্রকৃতি | নখে সুই ঢোকানো, প্লাস দিয়ে পেশি পেষণ ও ঠান্ডা পানির শক। |
| ঘটনার স্থান ও সময় | লাউড়গড় সীমান্ত বাজার এলাকা, ২৯ ডিসেম্বর সন্ধ্যা। |
| মামলার বিবরণ | ৩০ ডিসেম্বর থানায় মামলা দায়ের (বাদী: চাচা আব্দুর রহমান)। |
| গ্রেফতারের অবস্থা | আমির ও তরিকুল গ্রেফতার; সফিকুল ও রাকিব পলাতক। |
| পুলিশের ভূমিকা | পলাতক আসামিদের গ্রেফতারে একাধিক টিমের অভিযান চলমান। |
আইনি পদক্ষেপ ও পুলিশের কঠোর অবস্থান
এই পৈশাচিক ঘটনার পর নির্যাতিত কিশোরের চাচা আব্দুর রহমান বাদী হয়ে তাহিরপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় নামধারী চারজনসহ অজ্ঞাতনামা আরও ২-৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার পরপরই পুলিশ দ্রুত তৎপরতা চালিয়ে মূল হোতা আমিরকে গ্রেফতার করে এবং পরবর্তীতে তার ছেলে তরিকুলকেও আইনের আওতায় আনে। সুনামগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেন এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, একজন অসহায় কিশোরের ওপর এমন জঘন্য নির্যাতন কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। পলাতক থাকা বাকি আসামিদের গ্রেফতারে সীমান্ত এলাকাসহ সম্ভাব্য সকল স্থানে পুলিশের বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
সামাজিক উদ্বেগ ও ন্যায়বিচারের দাবি
পিতৃহীন এই কিশোরের ওপর এমন বর্বরোচিত হামলার খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এলাকাবাসীর মতে, কেবল চুরির সন্দেহে আইনের তোয়াক্কা না করে এভাবে নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়া এবং অমানবিক নির্যাতন করা এক ভয়াবহ অপরাধ। মানবাধিকার কর্মীরাও এই ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন হীন কাজ করার সাহস না পায়। বর্তমানে ভুক্তভোগী হাফিজ উদ্দিন চিকিৎসাধীন থাকলেও তার মানসিক ট্রমা কাটতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হবে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
