১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি—বাংলার ইতিহাসের এক অবিনাশী এবং অশ্রুসিক্ত অধ্যায়। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মদান এবং ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতায় সেদিন যোগ হয়েছিল এক অনন্য পূর্ণতা। পাকিস্তানের অন্ধকার কারাপ্রকোষ্ঠের মৃত্যুফাঁদ ছিন্ন করে এদিন স্বাধীন স্বদেশের মাটিতে পা রেখেছিলেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর এই ফিরে আসা ছিল মূলত অন্ধকারের বুক চিরে আলোর উদয় এবং একটি জাতির অপূর্ণ বিজয়ের চূড়ান্ত রূপায়ণ। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলেও বাঙালির আনন্দ ছিল অসম্পূর্ণ, কারণ তাদের প্রিয় নেতা তখনও শত্রুশিবিরে বন্দি ছিলেন। আন্তর্জাতিক প্রবল চাপে পাকিস্তান সরকার তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হলে ৮ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে তিনি পাকিস্তান ত্যাগ করে প্রথমে লন্ডনে যান। সেখানে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে ভারতের দিল্লি হয়ে ১০ জানুয়ারি দুপুরে ঢাকায় পৌঁছান। ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দরে অবতরণের পর বঙ্গবন্ধুকে বরণ করে নিতে অপেক্ষায় ছিল লাখো মানুষের উত্তাল সমুদ্র। সেই ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনের পথে তাঁর সঙ্গে ছিলেন ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহচর ড. কামাল হোসেনসহ কয়েকজন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ব্যক্তিত্ব। ঢাকার আকাশ-বাতাস সেদিন ছিল মানুষের উচ্ছ্বাসে, অশ্রুতে ও ভালোবাসায় ভরপুর। লাখো মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু বুঝে নিয়েছিলেন—এই দেশ, এই মানুষই তাঁর জীবনের অর্থ।

বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক যাত্রাপথের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন: সফরনামা ও ঘটনাক্রমের সারণি
| তারিখ ও সময় (১৯৭২) | স্থান ও ঘটনাবলি | বিশেষ গুরুত্ব ও তাৎপর্য |
| ৮ জানুয়ারি (ভোর) | লন্ডন, হিথ্রো বিমানবন্দর। | বিশ্ববাসীর কাছে স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ও সাংবাদিক সম্মেলন। |
| ৮ জানুয়ারি (দুপুর) | ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক। | স্বাধীন বাংলাদেশকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি প্রদানের আহ্বান ও সমর্থন লাভ। |
| ১০ জানুয়ারি (সকাল) | দিল্লি, ভারত। | ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও মিত্রবাহিনীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। |
| ১০ জানুয়ারি (দুপুর ১:৪১) | তেজগাঁও বিমানবন্দর, ঢাকা। | স্বাধীন স্বদেশে প্রত্যাবর্তন ও লাখো মানুষের আবেগঘন সংবর্ধনা। |
| ১০ জানুয়ারি (বিকেল) | রেসকোর্স ময়দান (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান)। | ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান ও রাষ্ট্র পরিচালনার দিক-নির্দেশনা প্রদান। |
আজ অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, এক শ্রেণির কুচক্রী মহল মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধুর অসামান্য অবদান নিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। ইতিহাসকে খণ্ডিত করে সত্য আড়াল করার এই অপচেষ্টা মূলত জাতির মেধা ও স্মৃতিকে পঙ্গু করে দেওয়ার একটি সুগভীর ষড়যন্ত্র। নতুন প্রজন্মের কাছে উদাত্ত আহ্বান থাকবে—আপনারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চটকদার মিথ্যাচার বা গুজবে কান না দিয়ে দেশি-বিদেশি প্রামাণ্য ইতিহাস পাঠ করুন। ইতিহাসের মূল উৎসে ফিরে তাকালেই সব ধোঁয়াশা কেটে যাবে, সত্য নিজেই কথা বলবে। শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন এই জনপদের মানুষের পরম আপনজন—তিনি শুধু একজন রাজনীতিক নন, ছিলেন বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিচ্ছবি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বাংলার প্রাণ-পুরুষ, স্বাধীনতার স্থপতি ও জাতির পিতা। তাঁর নেতৃত্ব, ত্যাগ ও দূরদর্শিতার ফলেই বাঙালি পেয়েছে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র, একটি লাল-সবুজ পতাকা ও একটি স্বকীয় পরিচয়।
‘বাঙলার দুখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো’—এই স্বপ্ন ছিল বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। শোষণহীন, বৈষম্যহীন ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, তা এখনো এ দেশের মানুষের অন্তরে জাগ্রত। ষড়যন্ত্রকারীরা যতই ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা করুক না কেন, বঙ্গবন্ধুর নাম বাংলার মাটির প্রতিটি ধূলিকণায় মিশে আছে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সে স্বপ্ন একদিন বাস্তবায়িত হবেই—নিকট ভবিষ্যতেই।
কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—
বাঙালি মাথা নত করে না।
বাঙালির সংগ্রাম থেমে থাকে না।
বাঙালির জয় অবশ্যম্ভাবী।
জয় বাংলা।

