নেদারল্যান্ডসের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট হুবহু নকল বা ‘ক্লোন’ করে সাধারণ মানুষকে উচ্চ মুনাফার টোপ দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সন্ধান পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এই প্রতারক চক্রের মূল হোতা হৃদয় হাসান এবং তাঁর অন্যতম সহযোগী তৌহিদ ভূঁইয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি, ২০২৬) সিআইডির পক্ষ থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই ডিজিটাল জালিয়াতির চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করা হয়।
অভিযান ও গ্রেপ্তারের পটভূমি
সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার জামালপুর সদর থানার স্টেশন রোড এলাকায় ঝটিকা অভিযান চালিয়ে প্রথমে তৌহিদ ভূঁইয়াকে (২১) আটক করা হয়। পরবর্তীতে তাঁর দেওয়া স্বীকারোক্তি ও তথ্যের ভিত্তিতে ওই চক্রের মূল পরিকল্পনাকারী হৃদয় হাসানকে (২১) গ্রেপ্তার করা হয়। মূলত রাজধানীর পল্টন থানায় এক ভুক্তভোগীর করা মামলার সূত্র ধরে এই অভিযান পরিচালিত হয়, যিনি এই চক্রের খপ্পরে পড়ে প্রায় ২৫ লাখ টাকা খুইয়েছেন।
প্রতারণার কৌশল ও ডিজিটাল জালিয়াতি
চক্রটি নেদারল্যান্ডসভিত্তিক পর্যটন ও আতিথেয়তা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘উইথলোকালস’ (Withlocals)-এর ওয়েবসাইট ক্লোন করে একটি ভুয়া অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং টেলিগ্রাম গ্রুপের মাধ্যমে নিজেদের ওই বিদেশি কোম্পানির কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিত। সাধারণ মানুষকে প্রলুব্ধ করতে তারা দাবি করত যে, এই প্ল্যাটফর্মে বিনিয়োগ করলে খুব দ্রুত এবং অবিশ্বাস্য হারে লভ্যাংশ পাওয়া যাবে।
নিচে এই চক্রের ডিজিটাল অপরাধের ধরণ ও সিআইডির অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যাদি সারণি আকারে তুলে ধরা হলো:
ওয়েবসাইট ক্লোন ও বিনিয়োগ জালিয়াতি চক্রের তথ্যচিত্র
| বিষয়ের ক্ষেত্র | বিস্তারিত তথ্য ও পরিসংখ্যান |
| নকলকৃত প্রতিষ্ঠান | উইথলোকালস (Withlocals), নেদারল্যান্ডস। |
| মূল হোতা | হৃদয় হাসান (বয়স ২১ বছর)। |
| গ্রেপ্তারের স্থান | স্টেশন রোড, জামালপুর সদর। |
| ব্যবহৃত প্রযুক্তি | ১৫টি কিউআর কোড ও একাধিক টেলিগ্রাম অ্যাকাউন্ট। |
| আর্থিক সরঞ্জাম | অন্যের নামে খোলা ৩০টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট। |
| ক্রিপ্টো লেনদেন | ২ টি বাইনান্স (Binance) অ্যাকাউন্ট। |
| মোবাইল ব্যাংকিং | বাইনান্সের সঙ্গে সংযুক্ত বিকাশ ও নগদ অ্যাকাউন্ট। |
| প্রাথমিক আত্মসাৎ | এক ব্যক্তির থেকে ২৫ লাখ টাকা (মোট অংক কয়েক কোটি হওয়ার সম্ভাবনা)। |
ডিজিটাল ফরেনসিক ও ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহার
গ্রেপ্তারকৃত হৃদয়ের কাছ থেকে জব্দ করা স্মার্টফোন ও ডিজিটাল ডিভাইস বিশ্লেষণ করে সিআইডির ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা অভিনব সব তথ্য পেয়েছেন। দেখা গেছে, হৃদয় অন্যের নামে খোলা প্রায় ৩০টি ব্যাংক হিসাব নিয়ন্ত্রণ করতেন। এছাড়া তাঁর নিয়ন্ত্রণে থাকা দুটি বাইনান্স অ্যাকাউন্টও অন্য ব্যক্তিদের নামে খোলা ছিল, যাতে অর্থ লেনদেনের সময় নিজের পরিচয় আড়াল করা যায়। এই ক্রিপ্টোকারেন্সি অ্যাকাউন্টগুলোর সঙ্গে তাঁর নিজস্ব বিকাশ ও নগদ অ্যাকাউন্ট সংযুক্ত ছিল, যা অর্থ পাচারের একটি আধুনিক কৌশল।
হৃদয় হাসান মূলত টেলিগ্রাম অ্যাপের মাধ্যমে তাঁর প্রতারণার নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতেন। তাঁর ফোনে ১৫টি বিশেষ কিউআর কোড পাওয়া গেছে, যা ব্যবহার করে তিনি বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন টেলিগ্রাম অ্যাকাউন্টে লগইন করতেন। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি এড়ানো সহজ হতো।
বর্তমান অবস্থা ও আইনি পদক্ষেপ
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন খান জানিয়েছেন, এই চক্রের সাথে আর কারা জড়িত এবং আত্মসাৎকৃত অর্থের বর্তমান অবস্থান জানতে আসামিদের ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করা হয়েছে। সিআইডির ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট এখন এই চক্রের ব্যাংক ট্রানজেকশন এবং বাইনান্স লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছে। একইসঙ্গে সাধারণ মানুষকে ইন্টারনেটে অপরিচিত কোনো সাইটে বিনিয়োগের আগে তার বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করার জন্য কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে।
