তরুণদের শক্তি ধ্বংসে নয়, সৃজনশীলতায়

“তরুণ”—এই এক শব্দেই লুকিয়ে আছে স্বপ্ন, সাহস, শক্তি ও অসীম সম্ভাবনা। কোনো জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার তরুণ প্রজন্মের চেতনা, দায়িত্ববোধ ও দূরদর্শিতার উপর। যত বিশুদ্ধ তাদের চিন্তা, তত দৃঢ় তাদের সংকল্প; আর যত দৃঢ় তাদের সংকল্প, তত এগিয়ে যায় সমাজ, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্র। বাংলাদেশের ইতিহাস প্রমাণ করেছে, নানা সংগ্রামের সময় তরুণরাই সর্বদা সামনের সারিতে দাঁড়িয়েছে, স্বপ্ন দেখেছে, এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে অক্লান্ত চেষ্টা করেছে।

কিন্তু ২০২৪ সালের গণ-উত্তালনের পর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্ররাজনীতিতে উগ্র ও চরমপন্থী গোষ্ঠীর প্রবেশ এবং ক্যাম্পাস নির্বাচনে তাদের অপ্রতিরোধ্য আধিপত্য দেশের নিরাপত্তা ও জাতীয় চেতনার জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাংস্কৃতিক প্রতীক ধ্বংস, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধ নষ্ট, নাট্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দমন, লোকসঙ্গীতজীবীদের ওপর আক্রমণ, মাজার অবমাননা ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি সহিংসতা—এগুলো সমস্তই বিপজ্জনক প্রবণতা নির্দেশ করছে। প্রশ্ন করা যায়, এরা কি সত্যিই আমাদের জাতির ভবিষ্যৎ ধারক তরুণ?

বাংলাদেশ তার স্বাধীনতা অর্জন করেছে ১৯৭১ সালের নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে। ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতা উদযাপন সেই বিজয়ের চূড়ান্ত ফল। এর পূর্বে ভাষা আন্দোলন (১৯৫২), শিক্ষা আন্দোলন (১৯৬২), ছয় দফা আন্দোলন (১৯৬৬), গণঅভ্যুত্থান (১৯৬৯), এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচন—সবই স্বাধীনতার পথে তরুণদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেখিয়েছে। ২০২৪ সালের গণ-উত্তালনের সময়ও সেই সাহসের চেতনাই দেশে জাগ্রত হয়েছিল।

দুর্ভাগ্যবশত, সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, কিছু তরুণ নেতা ২০২৪ সালের আন্দোলনের পর উগ্রপন্থা লুকিয়ে সাধারণ ছাত্র পরিচয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করছেন, ইতিহাস বিকৃত করছেন এবং চরমপন্থী মতাদর্শ প্রচার করছেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক ও স্মৃতিসৌধের উপর হামলা, প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক প্রকাশের দমন এবং ভিন্নমতকে হুমকি—সবই সঙ্কেত দিচ্ছে যে, উগ্রপন্থী গোষ্ঠী রাজনৈতিক প্রয়োজনে ধর্মকে ব্যবহার করে সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনগুলোতে আধিপত্য বিস্তার করেছে।

বাংলাদেশে তরুণদের প্রধান রাজনৈতিক ও সামাজিক অবদান

বছরআন্দোলন / ঘটনাতরুণদের ভূমিকা
১৯৫২ভাষা আন্দোলনভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষা
১৯৬২শিক্ষা আন্দোলনশিক্ষার অধিকার আন্দোলন
১৯৬৬ছয় দফা আন্দোলনরাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি
১৯৬৯গণঅভ্যুত্থানগণতান্ত্রিক সংস্কার পথপ্রদর্শন
১৯৭১মুক্তিযুদ্ধঅস্ত্র হাতে স্বাধীনতার সংগ্রাম
১৯৯০গণঅভ্যুত্থানসামরিক শাসনের অবসান
২০২৪গণ-উত্তালননাগরিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিতকরণ

রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধহীনতা ও রাজনৈতিক কুশীলবতা তরুণদের মানসিকতায় উগ্রতা জন্ম দিচ্ছে। ইতিহাসের সঠিক পাঠ ছাড়া ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শিক্ষিত করা হলে স্বাধীনতার মূল চেতনা, মানবতা ও ন্যায়বিচার বিপন্ন হবে।

তরুণ হল শুধু বয়স নয়; এটি এক মানসিক অবস্থা, এক শক্তি, যা সমাজ, রাষ্ট্র এবং বিশ্বের চেহারা বদলে দিতে পারে। তরুণদের শক্তি, সৃজনশীলতা ও সাহস ব্যবহার হওয়া উচিত দেশের উন্নয়ন, মানবতার সুরক্ষা এবং স্বাধীনতার মূল মূল্যবোধ রক্ষায়। উগ্রতা কখনো তরুণদের শক্তিকে বিলীন করতে পারবে না; বরং সঠিক দিশা প্রদর্শন করলে তরুণরা জাতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

— মঞ্জুর রশিদ বিদ্যুৎ
সামাজিক বিশ্লেষক, গবেষক ও নীতি প্রণেতা