গৃহঋণে বাড়ল ঋণসীমা ও সুযোগ

বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান নগরায়ণ, নির্মাণসামগ্রীর লাগাতার মূল্যবৃদ্ধি এবং মধ্য ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত মানুষের আবাসন চাহিদার প্রেক্ষাপটে গৃহঋণ নীতিমালা হালনাগাদ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন এই নীতির মাধ্যমে যোগ্য গ্রাহকদের জন্য আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেশি ঋণ নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। নীতিনির্ধারক ও ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই উদ্যোগ আবাসন ও নির্মাণ খাতে নতুন গতি সঞ্চার করবে এবং অর্থনীতির অন্যান্য খাতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং রেগুলেশন অ্যান্ড পলিসি ডিপার্টমেন্ট-১ থেকে মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারি, সংশোধিত নির্দেশনা জারি করা হয়। নতুন নীতিতে প্রথমবারের মতো গৃহঋণের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের আবাসন খাতে খেলাপি ঋণের (এনপিএল) অবস্থার ভিত্তিতে। অর্থাৎ, যে ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে দক্ষ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় তুলনামূলক ভালো, তারা গ্রাহকদের বেশি অঙ্কের ঋণ দিতে পারবে।

নীতিমালা অনুযায়ী, যেসব ব্যাংকের গৃহঋণ খাতে খেলাপি ঋণের হার ৫ শতাংশ বা তার নিচে, তারা একজন গ্রাহককে সর্বোচ্চ ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত গৃহঋণ দিতে পারবে। খেলাপি ঋণের হার ৫ শতাংশের বেশি কিন্তু ১০ শতাংশের মধ্যে হলে সর্বোচ্চ ঋণসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ কোটি টাকা। আর যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের বেশি, সেক্ষেত্রে একজন গ্রাহকের জন্য গৃহঋণের সর্বোচ্চ সীমা হবে ২ কোটি টাকা। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একদিকে যেমন ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়, অন্যদিকে ব্যাংকগুলোকে খেলাপি ঋণ কমাতে উৎসাহিত করছে।

নতুন নীতিতে ঋণ-টু-মূল্য (Loan to Value) অনুপাতের ক্ষেত্রেও সতর্কতা বজায় রাখা হয়েছে। কোনো বাড়ি বা ফ্ল্যাট ক্রয়ের মোট মূল্যের সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যাংক ঋণ দিতে পারবে। বাকি ন্যূনতম ৩০ শতাংশ গ্রাহককে নিজস্ব উৎস থেকে বিনিয়োগ করতে হবে। পাশাপাশি ঋণ অনুমোদনের আগে গ্রাহকের আয়, পেশাগত বা ব্যবসায়িক স্থিতিশীলতা এবং মাসিক কিস্তি পরিশোধের সক্ষমতা গভীরভাবে যাচাই করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে গ্রাহক অযথা অতিরিক্ত ঋণের চাপে পড়বেন না এবং ব্যাংকিং খাতও স্থিতিশীল থাকবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, গৃহঋণের পরিসর বাড়লে শুধু আবাসন খাতই নয়, বরং সিমেন্ট, রড, ইট, টাইলস, বৈদ্যুতিক ও স্যানিটারি সামগ্রীসহ নির্মাণসংশ্লিষ্ট বহু শিল্পে চাহিদা বাড়বে। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণের সঙ্গে ঋণসীমা যুক্ত থাকায় ব্যাংকগুলোর মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতা বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, গৃহঋণ সংক্রান্ত আগের সব নির্দেশনা বাতিল করে এই নতুন নীতিমালাই কার্যকর হবে এবং এটি অবিলম্বে প্রযোজ্য। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রত্যাশা, এই হালনাগাদ কাঠামোর মাধ্যমে গৃহঋণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা আরও সুদৃঢ় হবে।

নতুন গৃহঋণ নীতির সংক্ষিপ্ত চিত্র

গৃহঋণে খেলাপি ঋণের হারএকজন গ্রাহকের সর্বোচ্চ ঋণসীমা
৫% বা তার কম৪ কোটি টাকা
৫% এর বেশি থেকে ১০%৩ কোটি টাকা
১০% এর বেশি২ কোটি টাকা

এই ভারসাম্যপূর্ণ নীতির মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক একদিকে গৃহঋণের সুযোগ সম্প্রসারণ করছে, অন্যদিকে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করে ব্যাংক ও গ্রাহক—উভয়ের আস্থা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়েছে।