চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নজিরবিহীন অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল মতিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে, তিনি নিজের প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে উচ্চতর মেধাবী প্রার্থীদের বাদ দিয়ে নিজ কন্যাকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। এই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থী এবং শিক্ষা সংশ্লিষ্ট মহলে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে, যা চুয়েটের দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
মেধাক্রম ও প্রচলিত রীতির লঙ্ঘন
বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রচলিত নীতি অনুযায়ী, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিভাগের মেধাতালিকায় শীর্ষস্থানে থাকা (সাধারণত ১ম ও ২য়) শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। কিন্তু চুয়েটের তড়িৎ ও টেলিযোগাযোগ প্রকৌশল (ইটিই) বিভাগে এই দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী নিয়মটি লঙ্ঘিত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিতর্কিত এই নিয়োগের কেন্দ্রে রয়েছেন ইটিই ১৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী জেরিন তাসনিম মাইমুনা, যিনি উপাচার্যের কন্যা। তাঁর বিভাগীয় মেধাক্রম ছিল তৃতীয়। অভিযোগ রয়েছে, ১৮তম ব্যাচের ১ম স্থান অধিকারী মেধাবী শিক্ষার্থীকে পরিকল্পিতভাবে বাদ দিয়ে উপাচার্যের কন্যাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
নিয়োগ প্রক্রিয়ার এই অসংগতিগুলো নিচে সারণি আকারে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
চুয়েট ইটিই বিভাগের বিতর্কিত নিয়োগের সময়রেখা ও অসঙ্গতি
| ঘটনার পর্যায় | বিবরণ ও প্রেক্ষাপট | অনিয়মের অভিযোগ |
| প্রথম বিজ্ঞপ্তি (২০২৪) | ২ জন প্রভাষক পদের জন্য বিজ্ঞপ্তি। ১৮তম ব্যাচের ১ম ও ২য় মেধাবী আবেদন করেন। | পরীক্ষা সম্পন্ন হলেও ফলাফল না দিয়ে বোর্ড হঠাৎ বাতিল করা হয়। |
| বোর্ড বাতিলের কারণ | রহস্যজনক নিরবতা। কোনো যৌক্তিক কারণ দর্শানো হয়নি। | অভিযোগ: উপাচার্যের কন্যা তখন যোগ্য না হওয়ায় সময়ক্ষেপণ করা হয়। |
| দ্বিতীয় বিজ্ঞপ্তি (২০২৫) | ৩ জন প্রভাষক পদের জন্য পুনরায় বিজ্ঞপ্তি। ১৮ ও ১৯ ব্যাচ আবেদন করে। | ১৮তম ব্যাচের ১ম স্থান অধিকারীকে পুনরায় অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। |
| চূড়ান্ত নিয়োগ | ১৯তম ব্যাচের ৩ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। | ১ম ও ২য় এর সাথে ৩য় স্থানে থাকা উপাচার্যের কন্যাকে নিয়োগ প্রদান। |
নিয়োগ বোর্ড বাতিল ও নতুন বিজ্ঞপ্তির কারসাজি
২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে প্রথম যখন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল, তখন ১৮তম ব্যাচের শীর্ষ মেধাবীরা লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় সফলভাবে অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের ঠিক পূর্বমুহূর্তে নিয়োগ বোর্ডটি ভেঙে দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের দাবি, তৎকালীন সময়ে উপাচার্যের কন্যা শিক্ষাগতভাবে আবেদনের যোগ্য ছিলেন না বিধায় তাঁকে সুযোগ করে দিতেই ইচ্ছাকৃতভাবে পুরো প্রক্রিয়াটি ভণ্ডুল করা হয়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে নতুন বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ১৮তম ব্যাচের ১ম স্থান অধিকারীকে বাদ দিয়ে ১৯তম ব্যাচ থেকে উপাচার্যের কন্যাসহ তিনজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ ও দাবি
এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠেছেন। তাঁদের মতে, এটি কেবল স্বজনপ্রীতি নয় বরং ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে একটি মেধাবী প্রজন্মকে ধ্বংস করার শামিল। সাধারণ শিক্ষার্থীরা অবিলম্বে এই বিতর্কিত নিয়োগ বাতিল এবং একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন। তাঁরা মনে করেন, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে যদি মেধার বদলে স্বজনপ্রীতি প্রাধান্য পায়, তবে এর বৈশ্বিক র্যাঙ্কিং ও একাডেমিক মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
শিক্ষাবিদদের মতে, উপাচার্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে এমন কাজ উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার ওপর জনমানুষের আস্থা কমিয়ে দেয়। তাঁরা এই ঘটনার দ্রুত সুষ্ঠু তদন্ত ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
