কিশোরগঞ্জের ভৈরবে চলন্ত ট্রেনে টিকিট চেক করায় এক সিনিয়র ট্রেন টিকিট পরীক্ষককে (টিটি) ‘ছাত্র’ পরিচয়ে নৃশংসভাবে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) বিকেলে ভৈরব রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি ঘটে। হামলাকারী যুবকরা নিজেদের ছাত্র এবং জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের কৃতিত্ব দাবি করে বিনা টিকিটে ভ্রমণের অধিকার দাবি করেন। এই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় বইছে।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ:
রেলওয়ে সূত্র জানায়, সোমবার দুপুর ৩টায় ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা চট্টগ্রামগামী ‘চট্টলা এক্সপ্রেস’ ট্রেনটিতে দায়িত্ব পালন করছিলেন সিনিয়র টিটি তানজিম ফরাজি। ট্রেনটি বিমানবন্দর স্টেশন পার হওয়ার পর তিনি টিকিট পরীক্ষা শুরু করেন। টঙ্গী স্টেশন ছাড়ার পর ৮-১০ জন যুবক নিজেদের ‘ছাত্র’ পরিচয় দিয়ে টিকিট কাটতে অস্বীকৃতি জানান। টিটি তাঁদের আইন মেনে টিকিট সংগ্রহ করার অনুরোধ করলে তাঁরা উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে বলেন, “দেশ তো আমরাই স্বাধীন করেছি, আমাদের আবার টিকিট লাগবে কেন?” একপর্যায়ে তাঁদের সঙ্গে থাকা এক মধ্যবয়স্ক যাত্রীর কাছ থেকে নিয়ম অনুযায়ী ২২০ টাকা ভাড়া আদায় করলে যুবকরা টিটির ওপর চরমভাবে ক্ষিপ্ত হন।
হত্যাকাণ্ড ও আইনি প্রক্রিয়ার বিস্তারিত তথ্য নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো:
ভৈরবে রেলওয়ে টিটির ওপর হামলার সংক্ষিপ্ত তথ্যাবলি
| বিষয়ের ক্ষেত্র | বিস্তারিত বিবরণ |
| ভুক্তভোগী | তানজিম ফরাজি (সিনিয়র টিটি, বাংলাদেশ রেলওয়ে) |
| ঘটনার সময় | ৫ জানুয়ারি, সোমবার বিকেল |
| ট্রেনের নাম | চট্টলা এক্সপ্রেস (ঢাকা-চট্টগ্রাম) |
| অভিযুক্তদের দাবি | তারা ছাত্র এবং দেশ স্বাধীন করেছে বলে টিকিট কাটবে না |
| হামলার স্থান | ভৈরব রেলওয়ে স্টেশন ও সংলগ্ন মসজিদ এলাকা |
| আঘাতের ধরণ | এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি ও লাঞ্ছনা |
| আইনি পদক্ষেপ | রেলওয়ে পুলিশ কর্তৃক অপরাধীদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে |
শারীরিক লাঞ্ছনা ও উদ্ধার:
চট্টলা এক্সপ্রেস ট্রেনটি ভৈরব স্টেশনে পৌঁছালে টিটি তানজিম ফরাজি তাঁর দায়িত্ব শেষ করে নিচে নামেন। তিনি যখন স্টেশনের পাশের মসজিদে নামাজ পড়তে যাচ্ছিলেন, তখন ওই যুবকরা তাঁকে ঘিরে ধরে এবং জোরপূর্বক টেনেহেঁচড়ে পুনরায় ট্রেনে তুলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। টিটি তাঁদের এই অন্যায্য আবদারে রাজি না হওয়ায় তাঁরা প্রকাশ্যে তাঁকে এলোপাতাড়ি মারধর শুরু করেন। স্থানীয় বাসিন্দারা এগিয়ে এসে হামলাকারীদের হাত থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় টিটিকে উদ্ধার করেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলাকারীরা ভৈরবের বাইরের বাসিন্দা এবং তাঁরা ছাত্র পরিচয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে এলাকার সুনাম নষ্ট করছে।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য:
ভৈরব রেলওয়ে স্টেশন অফিসার মো. ইউসুফ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, রেলওয়ে বিভাগ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে। তিনি বলেন, “কারা হামলা করেছে তা জানার চেষ্টা করছি এবং ভিডিও ফুটেজ দেখে তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া চলছে।” ভৈরব রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাঈদ আহমেদ জানান, টিটিকে মারধরের বিষয়টি পুলিশ অবগত। লিখিত অভিযোগ পেলেই দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই ঘটনাটি সরকারি কর্মচারীদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টি আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। আন্দোলনের নাম ভাঙিয়ে যারা এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছে, তাঁদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিক সমাজ। ভুক্তভোগী টিটি বর্তমানে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
