বাংলাদেশে প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান প্রসারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ইলেকট্রনিক পণ্যের ব্যবহার। তবে এর বিপরীত পিঠ হিসেবে তৈরি হচ্ছে বিশাল পরিমাণ ইলেকট্রনিক বর্জ্য বা ই-বর্জ্য। বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের মতে, বাংলাদেশে ই-বর্জ্যের বার্ষিক বাজারের আর্থিক মূল্য প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা। কিন্তু আধুনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রিসাইক্লিং অবকাঠামো এবং টেকসই ব্যবস্থাপনার অভাবে এই খাতের প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকাই প্রতিবছর হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে।
অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও ধাতু নিষ্কাশন নষ্ট বা ফেলে দেওয়া মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, ব্যাটারি এবং ফ্রিজ-এসির মতো ডিজিটাল ডিভাইসগুলো ই-বর্জ্যের প্রধান উৎস। এসব বর্জ্যে কপার, ব্রোঞ্জ, জিংক এবং প্লাস্টিকের পাশাপাশি স্বর্ণ, প্লাটিনাম, প্যালাডিয়াম ও রোডিয়ামের মতো অতি মূল্যবান ধাতু থাকে। সঠিক পদ্ধতিতে এই ধাতুগুলো সংগ্রহ করা গেলে শিল্প খাতের কাঁচামাল আমদানিতে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব। বাংলাদেশ মোবাইল আমদানিকারক সংস্থার (বিএমপিআইএ) তথ্যানুযায়ী, প্রতিবছর দেশে প্রায় ৩০ লাখ মোবাইল ফোন ই-বর্জ্যে রূপান্তরিত হচ্ছে।
নিচে বাংলাদেশের ই-বর্জ্য পরিস্থিতির একটি তুলনামূলক পরিসংখ্যান তুলে ধরা হলো:
বাংলাদেশের ই-বর্জ্য খাতের চিত্র ও পরিসংখ্যান
| বিষয়ের ক্ষেত্র | বিস্তারিত তথ্য ও পরিসংখ্যান |
| বার্ষিক ই-বর্জ্য উৎপাদন | প্রায় ২৮ লাখ ১০ হাজার টন (প্রতিবছর ৩০% বৃদ্ধি) |
| আর্থিক মূল্যের সম্ভাবনা | ৬,০০০ কোটি টাকা |
| ব্যবস্থাপনাজনিত আর্থিক ক্ষতি | ৫,৫০০ কোটি টাকা (৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) |
| রিসাইক্লিং অবকাঠামো | ৩% আনুষ্ঠানিক, ৯৭% অনানুষ্ঠানিক (ঝুঁকিপূর্ণ) |
| ব্যবহারকারীর অসচেতনতা | ৮৮% ভোক্তা বর্জ্য ফেলার সঠিক পদ্ধতি জানেন না |
| আইনি কাঠামো | বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা ২০২১ (অকার্যকর) |
| ভবিষ্যৎ ঝুঁকি (২০৬০) | সোলার প্যানেল থেকে ৫৫ লাখ টন বর্জ্য তৈরির শঙ্কা |
পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ই-বর্জ্যে যেমন মূল্যবান সম্পদ রয়েছে, তেমনি এতে সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম ও ব্রোমিনযুক্ত বিষাক্ত পদার্থের উপস্থিতিও রয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ৯৭ শতাংশ ই-বর্জ্য অনানুষ্ঠানিকভাবে ভাঙারি শ্রমিকদের দ্বারা প্রক্রিয়াজাত হয়। কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়াই এসব পণ্য ভাঙার ফলে শ্রমিকরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন এবং বিষাক্ত বর্জ্য মাটি ও জলাশয়কে দূষিত করে তুলছে। টিআইবি আরও জানায়, ৭২ শতাংশ মানুষ নষ্ট ইলেকট্রনিক ডিভাইস ঘরের কোণেই জমিয়ে রাখেন, যা পরোক্ষভাবে স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে।
কাঠামোগত ব্যর্থতা ও পাচার সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও প্রতিবছর প্রায় ১৫ হাজার টন ই-বর্জ্য বিদেশে পাচার করা হচ্ছে। এতে মূল্যবান সার্কিট বোর্ড ও আইসি রফতানির মাধ্যমে বিদেশি কোম্পানিগুলো লাভবান হচ্ছে, আর বাংলাদেশ তার সম্পদ হারাচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিটিআরসির মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং যথাযথ তদারকি না থাকায় লাইসেন্সধারী ব্যবসায়ীরাও এই খাতে বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। ই-বর্জ্যের পুনরাবর্তন নিয়ে কাজ করা সংস্থা ডব্লিউইইই (WEEE) সোসাইটির মতে, সংগ্রহ পদ্ধতি আধুনিকীকরণ করতে পারলে বাংলাদেশ এই খাত থেকে বড় ধরণের বৈশ্বিক অংশীদার হতে পারতো।
ভবিষ্যৎ শঙ্কা ও করণীয় আগামী কয়েক দশকে ই-বর্জ্যের পরিমাণ কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে। বিশেষ করে সোলার প্যানেল, বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যাটারি এবং সরকারি পর্যায়ে কেনা ইভিএম মেশিনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সতর্ক করেছেন যে, দ্রুত প্রাতিষ্ঠানিক সমাধান না হলে এই বিষাক্ত বর্জ্য জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য অপ্রতিরোধ্য বিপর্যয় ডেকে আনবে। ই-বর্জ্যকে অভিশাপের পরিবর্তে সম্পদে রূপান্তর করতে হলে জাতীয় পর্যায়ে গণসচেতনতা, কঠোর আইনি প্রয়োগ এবং পরিবেশবান্ধব রিসাইক্লিং শিল্পে সরকারি প্রণোদনা দেওয়া জরুরি।
