বিদেশি পর্যবেক্ষকদের আতিথেয়তা ইসির বৈষম্যমূলক ও বিতর্কিত সিদ্ধান্ত: টিআইবি

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিদেশি পর্যবেক্ষকদের আবাসন ও যাতায়াতসহ যাবতীয় ব্যয়ভার বহনের যে সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশন (ইসি) গ্রহণ করেছে, তাকে ‘অপরিণামদর্শী’ ও ‘স্বার্থের দ্বন্দ্বের প্রচ্ছন্ন উদাহরণ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি মনে করে, নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার ও জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী জনআকাঙ্ক্ষা পূরণের পরিবর্তে এমন পদক্ষেপ নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণের পরিবেশকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) এক বিবৃতিতে টিআইবি এই সিদ্ধান্তকে বৈষম্যমূলক অভিহিত করে তা বাতিলের জোরালো দাবি জানিয়েছে।

বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ানোর অজুহাতে বিদেশি পর্যবেক্ষকদের রাষ্ট্রীয় অর্থে আপ্যায়ন করা হলে তাঁদের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। ইসির এই সিদ্ধান্ত একদিকে যেমন আর্থিক অপচয়, অন্যদিকে এটি দেশি পর্যবেক্ষকদের প্রতি এক ধরণের অবজ্ঞা ও বৈষম্য। কারণ, দেশি পর্যবেক্ষকদের জন্য এমন কোনো সুযোগের ঘোষণা কমিশন দেয়নি। ড. ইফতেখারুজ্জামান প্রশ্ন তোলেন, নির্বাচন কমিশনের আতিথেয়তায় থেকে পর্যবেক্ষকরা কতটা স্বাধীনভাবে কমিশনেরই ভুলত্রুটি বা ভূমিকা মূল্যায়ন করতে পারবেন? এটি সরাসরি ‘স্বার্থের দ্বন্দ্ব’ (Conflict of Interest) তৈরি করবে।

নিচে নির্বাচন কমিশনের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ও টিআইবির আপত্তির কারণগুলো সারণি আকারে তুলে ধরা হলো:

ইসির সিদ্ধান্ত বনাম টিআইবির পর্যবেক্ষণ

বিষয়ের ক্ষেত্রনির্বাচন কমিশনের প্রস্তাবিত পদক্ষেপটিআইবির উত্থাপিত আপত্তি ও ঝুঁকি
ব্যয়ভার বহনবিদেশি পর্যবেক্ষকদের থাকা-খাওয়ার খরচ দেবে ইসি।এটি স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি করবে ও নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ণ হবে।
বৈষম্যমূলক নীতিকেবল বিদেশিদের জন্য বিশেষ সুবিধা বরাদ্দ।দেশি পর্যবেক্ষকদের বঞ্চিত করা চরম বৈষম্যমূলক কাজ।
নৈতিকতাআন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের কৌশল।আতিথেয়তা গ্রহণকারীরা ‘ভাড়াটে পর্যবেক্ষক’ হিসেবে গণ্য হতে পারেন।
অতীত অভিজ্ঞতা২০১৮ ও ২০২৪ সালের বিতর্কিত মডেলের অনুসরণ।বিগত বিতর্কিত নির্বাচনগুলোর পথ অনুসরণ করা হঠকারিতা।
আর্থিক উৎসজনগনের করের টাকা বা রাষ্ট্রীয় তহবিল।রাষ্ট্রের অর্থ অপচয় করে নির্বাচন বৈধ করার চেষ্টা ব্যর্থ হতে বাধ্য।
মূল্যায়ন পদ্ধতিইসির তত্ত্বাবধানে পর্যবেক্ষণ।কমিশনের অধীনস্থ হয়ে কমিশনকে মূল্যায়ন করা অসম্ভব।

টিআইবি উল্লেখ করেছে যে, ২০০৮ সালের আগে সুষ্ঠু নির্বাচনগুলোতে বিদেশি পর্যবেক্ষকদের এমন সুযোগ দেওয়ার প্রয়োজন পড়েনি। কিন্তু ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনগুলোকে বৈধতা দিতেই এই ব্যবস্থার চল শুরু হয়েছিল। বর্তমান কমিশন যদি পুনরায় সেই একই পথ অনুসরণ করে, তবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অর্জিত জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ভুলুণ্ঠিত হবে।

বিবৃতিতে ড. ইফতেখারুজ্জামান বিদেশি পর্যবেক্ষকদের প্রতিও বিশেষ আহ্বান জানিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও পেশাদারিত্বের খাতিরে তাঁদের উচিত এ ধরণের সরকারি আতিথেয়তা বর্জন করা। কোনো স্বাধীন পর্যবেক্ষক সংস্থা যদি সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের অর্থায়নে দায়িত্ব পালন করে, তবে তাদের বস্তুনিষ্ঠতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। টিআইবি আশা প্রকাশ করে যে, নির্বাচন কমিশন এই অবিবেচক সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে একটি সত্যিকারের নিরপেক্ষ ও বৈষম্যহীন নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করবে।