পাঁচ ইসলামী ব্যাংকে আমানত সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ

পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের চলমান একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার মধ্যে ঘোষিত নতুন আমানত সুরক্ষা স্কিম ঘিরে ব্যাপক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এই অনিশ্চয়তা হাজারো আমানতকারীর মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে এবং ব্যাংক শাখাগুলোতে ভিড় ও চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক গ্রাহক জরুরি প্রয়োজনে অর্থ তুলতে গিয়ে জটিলতার মুখে পড়ছেন, অথচ শাখা পর্যায়ের কর্মকর্তারাও স্পষ্ট নির্দেশনা না পাওয়ায় সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারছেন না। এখনো কোনো বিশৃঙ্খলা বা অপ্রীতিকর ঘটনার খবর না মিললেও, সার্বিক পরিস্থিতি আমানতকারীদের আস্থায় স্পষ্ট ভাঙন ধরিয়েছে।

ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত তিন কার্যদিবসে এই পাঁচ ব্যাংক থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকা আমানত উত্তোলন হয়েছে। এই বিপুল অঙ্কের অর্থ প্রত্যাহার একদিকে গ্রাহকদের তাৎক্ষণিক নগদ চাহিদার প্রতিফলন, অন্যদিকে একীভূতকরণ প্রক্রিয়ায় আস্থাহীনতার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের সময়ে স্বচ্ছতা ও ধারাবাহিক যোগাযোগের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

উদ্বেগ প্রশমনে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের জন্য একটি আমানত সুরক্ষা স্কিম ঘোষণা করে। স্কিম অনুযায়ী, প্রতিটি আমানতকারীর ২ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত সম্পূর্ণ সুরক্ষিত এবং যে কোনো সময় উত্তোলনযোগ্য। এর বেশি আমানতের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে অর্থ ছাড়ের কথা বলা হয়েছে। চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাবের অর্থ নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কিস্তিতে উত্তোলনের সুযোগ থাকবে, যা পুরোপুরি পেতে সর্বোচ্চ ২৪ মাস সময় লাগতে পারে। স্থায়ী আমানতের ক্ষেত্রে মেয়াদ বাড়ানো এবং বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী মুনাফা নির্ধারণের কথাও জানানো হয়েছে।

তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে নীতিমালা ও প্রয়োগের মধ্যে বড় ধরনের ফাঁক লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বহু গ্রাহক অভিযোগ করছেন, ঘোষিত সুরক্ষিত ২ লাখ টাকাও তারা তুলতে পারছেন না। কোথাও কোথাও কেবল মূলধন ছাড় করা হচ্ছে, কিন্তু জমাকৃত সুদ বা মুনাফা আটকে রাখা হচ্ছে। স্থায়ী আমানতের ক্ষেত্রে নিয়মিত মুনাফা প্রদান বন্ধ রয়েছে; যদিও সেই মুনাফা সঞ্চয়ী হিসাবে জমা হচ্ছে, তা উত্তোলনযোগ্য নয়। আমানতকারীদের দাবি, জমাকৃত মুনাফা উত্তোলনের সুযোগ দিলে আতঙ্ক অনেকটাই কমবে।

আরও জটিলতা তৈরি হয়েছে প্রবাসী আয়, সঞ্চয়পত্র ও বন্ড থেকে প্রাপ্ত সুদ এবং যৌথ হিসাবের ক্ষেত্রে। এসব অর্থ সাধারণত সঞ্চয়ী হিসাবে জমা হলেও বর্তমানে তা অবরুদ্ধ। যৌথ হিসাবের ক্ষেত্রে কোনো পক্ষই অর্থ তুলতে না পারায় অনেক পরিবার চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে।

বর্তমান অবস্থার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র নিচের টেবিলে তুলে ধরা হলো—

হিসাবের ধরনউত্তোলনের অবস্থাপ্রধান সমস্যা
চলতি হিসাবসীমিতমুনাফা উত্তোলনযোগ্য নয়
সঞ্চয়ী হিসাবসীমিতসুদ ও রেমিট্যান্স স্থগিত
স্থায়ী আমানতস্থগিত/সীমিতমুনাফা প্রদান বন্ধ
যৌথ হিসাবসীমিতকোনো পক্ষই উত্তোলন করতে পারছে না

দুটি ব্যাংকের প্রশাসক জানিয়েছেন, বিদ্যমান নির্দেশনার আওতায় বিমাকৃত অংশের বাইরে অর্থ প্রদান সম্ভব নয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ধীরে ধীরে লেনদেন সুবিধা ফিরবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার সফলতা এখন নির্ভর করছে দ্রুত অস্পষ্টতা দূর করা এবং একক, সুস্পষ্ট নির্দেশনা জারির ওপর। ব্যাংক কর্মকর্তা ও গ্রাহক—উভয়ের কাছে পরিষ্কার বার্তা পৌঁছাতে পারলেই কেবল আমানতকারীদের আস্থা ফিরবে এবং পুরো প্রক্রিয়া বিশ্বাসযোগ্যভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।