সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শাহ আরেফিন টিলা (সারপিন টিলা) এখন পাথরখেকো সিন্ডিকেটের নজিরবিহীন লুটপাটের শিকার। জেলার অন্যান্য কোয়ারিগুলোতে অবৈধ পাথর উত্তোলন প্রায় বন্ধ হলেও, সারপিন টিলায় চলছে ধ্বংসযজ্ঞের মহোৎসবে। একসময়ের সুউচ্চ এই টিলাটি এখন প্রায় ৬০ ফুট গভীর পুকুরে পরিণত হয়েছে। প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান ও মামলার তোয়াক্কা না করেই প্রভাবশালী এই চক্রটি প্রতিদিন কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ করছে।
গত বছর আগস্টে র্যাবের আলোচিত সাবেক ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারওয়ার আলম সিলেটের জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর পাথর লুট বন্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন। তাঁর হস্তক্ষেপে সাদাপাথরসহ অন্যান্য কোয়ারিতে শৃঙ্খলা ফিরলেও সারপিন টিলার পরিস্থিতি এখনো অপরিবর্তিত। নভেম্বরে তিনি নিজে টিলাটি পরিদর্শন করে এর ক্ষতবিক্ষত রূপ দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থার নির্দেশ দেন। তবে স্থানীয় প্রভাবশালী চক্র প্রশাসনের এই নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
সারপিন টিলার লুটপাটের ধরণ ও বর্তমান চিত্র নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো:
সারপিন টিলায় পাথর লুটের চিত্র ও সিন্ডিকেটের প্রভাব
| বিষয়ের বিবরণ | বর্তমান পরিস্থিতি ও তথ্য | প্রভাব ও মন্তব্য |
| লুটপাটের কৌশল | দিনে পাথর উত্তোলন ও রাতে ট্রাক্টরে পরিবহন। | প্রশাসনের নজরদারি এড়ানোর অপকৌশল। |
| যন্ত্রপাতির ব্যবহার | শতাধিক অবৈধ ‘বোমা মেশিন’ সক্রিয়। | পরিবেশ ও টিলার ভূ-প্রকৃতি ধ্বংসপ্রাপ্ত। |
| খনন ও গভীরতা | টিলাকে পুকুর বানিয়ে ৫০-৬০ ফুট নিচে খনন। | ভূমিধস ও শ্রমিকের প্রাণহানির ঝুঁকি। |
| জড়িত সিন্ডিকেট | জালিয়ারপাড়, চিকাডহর ও পাড়ুয়ার প্রভাবশালীরা। | রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ৪৭ জন হোতা সক্রিয়। |
| আইনি পদক্ষেপ | গত ১৫ দিনে অর্ধশত আটক ও ৪৭ জনের নামে মামলা। | মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় লুট বন্ধ হচ্ছে না। |
স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, এই সিন্ডিকেটটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং এতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পদধারী বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা জড়িত রয়েছেন। তারা শতাধিক বোমা মেশিন দিয়ে ভূগর্ভ থেকে পাথর তুলে পার্শ্ববর্তী এলাকায় জমা করে রাখে। দিনের আলোতে শত শত শ্রমিকের উপস্থিতিতে এই কাজ চললেও রহস্যজনক কারণে মূল হোতাদের আটক করা সম্ভব হচ্ছে না। রাতের আঁধারে এই পাথর ভোলাগঞ্জ ও পাড়ুয়া এলাকার বিভিন্ন ক্রাসার মেশিনে নিয়ে যাওয়া হয় এবং গুঁড়ো করে বাজারে বিক্রি করা হয়।
কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি মো. শফিকুল ইসলাম খান পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্বীকার করে বলেন, “আমরা প্রায় প্রতিদিনই অভিযান চালাচ্ছি এবং বোমা মেশিন ধ্বংস করছি। কিন্তু এলাকাটি দুর্গম এবং স্থানীয় জনসংখ্যার একটি বড় অংশ এই কাজের সাথে জড়িত থাকায় লুটপাট পুরোপুরি থামানো যাচ্ছে না।” তিনি আরও জানান, সিন্ডিকেটের ৪৭ জন মূল হোতার বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে, তবে তারা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে থাকায় গ্রেপ্তার করতে বেগ পেতে হচ্ছে।
পরিবেশবাদীরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, যেভাবে টিলা খুঁড়ে পাথর বের করা হচ্ছে, তাতে নিকট ভবিষ্যতে বড় ধরনের পরিবেশ বিপর্যয় ও ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে। প্রশাসনিক কঠোরতার পাশাপাশি রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও স্থানীয় সচেতনতা ছাড়া এই ‘পাথরখেকো’ সিন্ডিকেটকে থামানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
