খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩ই জানুয়ারি ২০২৬, ৬:৫৬ এএম

নতুন বছরের প্রথম প্রহর। সুইজারল্যান্ডের মনোরম আল্পস পর্বতমালাবেষ্টিত ক্রানস মন্টানা স্কি রিসোর্টটি তখন উৎসবের আলোয় ঝলমলে। পর্যটকদের কলতানে মুখর ‘লে কনস্টেলেশন’ পানশালায় চলছিল বর্ষবরণের উদ্দাম নৃত্য আর গান। সুইজারল্যান্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা তরুণ-তরুণীদের চোখে ছিল নতুন বছরের রঙিন স্বপ্ন। কিন্তু রাত দেড়টার দিকে এক আকস্মিক অগ্নিকাণ্ড সেই আনন্দকে মুহূর্তেই বিভীষিকায় পরিণত করে। হাড়কাঁপানো শীতের রাতে আগুনের লেলিহান শিখা কেড়ে নেয় অন্তত ৪০টি তাজা প্রাণ।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, উৎসবের এক পর্যায়ে যখন একজন বারটেন্ডার তাঁর সহকর্মীকে কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন, তখন ওই নারীর হাতে থাকা শ্যাম্পেন বোতলের জ্বলন্ত ফুলঝুরি থেকে পানশালার কাঠের সিলিংয়ে আগুন ধরে যায়। ভূগর্ভস্থ পানশালা হওয়ার কারণে বাতাস চলাচলের পথ ছিল সীমিত, ফলে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পুরো ছাদ আগুনের গ্রাসে চলে যায়। অনেকে একে সিসা পাইপের কয়লা থেকে সৃষ্ট আগুন বলেও ধারণা করছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, আগুনের লেলিহান শিখার মাঝে মানুষ দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছোটাছুটি করছেন, অথচ তখনও প্রেক্ষাপটে উৎসবের গান বেজে চলছিল। ফ্রান্স থেকে আসা পর্যটক এমা ও আলবেন জানান, কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানেই পুরো ছাদ ধসে পড়ার মতো অবস্থা তৈরি হয়েছিল। দমবন্ধ করা কালো ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল চারপাশ।
দুর্ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই ঘটনাস্থলে ছুটে যায় উদ্ধারকারী দল। ৪০টি অ্যাম্বুলেন্স, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের বিশাল বহর এবং ১০টি হেলিকপ্টার সারা রাত ধরে উদ্ধার অভিযান চালায়। অনেকে জানালা ভেঙে বা কাঁচের দেয়াল সরিয়ে বের হতে পারলেও বিপুল সংখ্যক মানুষ ভেতরে আটকা পড়েন। উদ্ধারকারীরা জানান, তারা অনেককে দগ্ধ অবস্থায় বের করে এনেছেন, যাঁদের পরনের পোশাক পর্যন্ত পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল।
ঘটনার সংক্ষিপ্ত সারণি ও পরিসংখ্যান:
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
| ঘটনাস্থল | লে কনস্টেলেশন পানশালা, ক্রানস মন্টানা, সুইজারল্যান্ড |
| দুর্ঘটনার সময় | নতুন বছরের প্রথম দিন, রাত ১:৩০ মিনিট (আনুমানিক) |
| প্রাণহানি | ৪০ জন (নিশ্চিতকৃত) |
| আহত | ১১৫ জন (গুরুতর দগ্ধসহ) |
| উদ্ধারকারী দল | ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, ১০টি হেলিকপ্টার ও ৪০টি অ্যাম্বুলেন্স |
| রাষ্ট্রীয় শোক | ৫ দিন (জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে) |
বৃহস্পতিবার দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন সুইজারল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট গায় পারমেলিন। তিনি এই ঘটনাকে ‘জাতীয় শোক’ হিসেবে বর্ণনা করেন। শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তিনি বলেন, “যে সময়টি আনন্দ ও স্বপ্নের হওয়ার কথা ছিল, তা আজ অন্ধকারে ছেয়ে গেছে।” অগ্নিকাণ্ডের স্মরণে সুইজারল্যান্ডে পাঁচ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে।
স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তা ফ্রেডরিখ গিসলার জানিয়েছেন, প্রাথমিক তদন্তে এটি কোনো নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড বলে মনে হচ্ছে না, বরং অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। বর্তমানে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা আগুনের সঠিক কারণ অনুসন্ধানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছেন। ক্রানস মন্টানার যে পথে উৎসবের পোস্টার শোভা পাচ্ছিল, সেখানে এখন কেবলই শোকাতুর মানুষের দীর্ঘশ্বাস আর স্তব্ধতা।
মন্তব্য