সমাজতান্ত্রিক ধারায় নিউইয়র্কের নতুন মেয়র জোহরান মামদানি

নিউইয়র্ক সিটির ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হলো। তীব্র শীত আর হিমাঙ্কের নিচে থাকা তাপমাত্রাকে উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে শপথ নিলেন শহরের প্রথম মুসলিম মেয়র জোহরান মামদানি। লোয়ার ম্যানহাটানের সিটি হলের সামনে জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে পবিত্র কোরআন ছুঁয়ে শপথ নেওয়ার মাধ্যমে ৩৪ বছর বয়সী এই রাজনীতিক কেবল ইতিহাসই গড়েননি, বরং দায়িত্ব পালনের প্রথম দিনেই নিজের সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। সাবেক মেয়র এরিক অ্যাডামসের বিতর্কিত ইসরায়েলপন্থি নির্বাহী আদেশ বাতিল করার মাধ্যমে তিনি এক শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছেন।

অভিষেক ভাষণে মামদানি সরাসরি ঘোষণা করেন যে, তিনি একজন ‘গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী’ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন এবং সেই পরিচয় ও আদর্শ নিয়েই শহর শাসন করবেন। তার প্রশাসন হবে স্বচ্ছ এবং ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবার জন্য উন্মুক্ত। মামদানির এই জয়কে দেখা হচ্ছে শ্রমজীবী মানুষের জয় হিসেবে, যার প্রতিফলন ঘটেছে তার শপথ অনুষ্ঠানের বিশাল জনসমাগমে। ম্যানহাটানের মারে স্ট্রিট থেকে লিবার্টি স্ট্রিট পর্যন্ত বিস্তৃত সাতটি ব্লকে আয়োজিত এই ‘ব্লক পার্টিতে’ প্রায় ৫০ হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করেন।

প্রথম দিনের ঐতিহাসিক পদক্ষেপ ও ইসরায়েল ইস্যু

জোহরান মামদানি দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সাবেক মেয়র এরিক অ্যাডামসের জারি করা বিতর্কিত নির্বাহী আদেশগুলো বাতিলের ঘোষণা দেন। বিশেষ করে, গত মাসে জারি করা সেই আদেশটি তিনি রদ করেন যেখানে মেয়র কার্যালয়ের কর্মচারীদের ইসরায়েল বর্জন কিংবা দেশটি থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছিল। মামদানির এই সিদ্ধান্তকে মানবাধিকার কর্মী ও তার সমর্থকরা স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তার প্রশাসন কোনো বিশেষ রাষ্ট্র বা গোষ্ঠীর চেয়ে সাধারণ মানুষের নাগরিক অধিকার ও বাক-স্বাধীনতাকে অগ্রাধিকার দেবে।

রাজনৈতিক মিত্র ও পথপ্রদর্শক

মামদানির এই শপথ অনুষ্ঠানটি ছিল দুই ধাপের। প্রথম ধাপটি ৩১ ডিসেম্বর মধ্যরাতে ওল্ড সিটি হল পাতালরেল স্টেশনে আয়োজিত হয় এবং দ্বিতীয়টি হয় উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে। সেখানে তাকে পরিচয় করিয়ে দেন প্রভাবশালী কংগ্রেস সদস্য আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ। অন্যদিকে, তাকে শপথ পাঠ করান মার্কিন রাজনীতির বর্ষীয়ান নেতা বার্নি স্যান্ডার্স, যাকে মামদানি নিজের আদর্শ ও পথপ্রদর্শক মনে করেন। স্যান্ডার্স তার বক্তব্যে বলেন, ঘৃণা ও বিভাজনের এই সময়ে মামদানি নিউইয়র্কবাসীকে এক হয়ে কাজ করার নতুন আশা দেখিয়েছেন।

একনজরে জোহরান মামদানির প্রোফাইল ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ:

বিষয়বিস্তারিত বিবরণ
পরিচয়নিউইয়র্ক সিটির প্রথম মুসলিম মেয়র
শপথ পদ্ধতিপবিত্র কোরআন ছুঁয়ে শপথ গ্রহণ
রাজনৈতিক দর্শনগণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র (Democratic Socialism)
মূল প্রতিশ্রুতিবিনামূল্যে বাস সেবা, শিশু পরিচর্যা ও বাড়িভাড়া হ্রাস
বড় চ্যালেঞ্জ১০০০ কোটি ডলারের বিশাল তহবিল সংগ্রহ
তহবিল সংগ্রহের উৎসধনীদের ওপর উচ্চহারে কর আরোপ
ফেডারেল সম্পর্কট্রাম্প প্রশাসনের তহবিল কর্তনের হুমকি মোকাবিলা

আর্থিক সংকট ও আগামীর পথচলা

মেয়র মামদানির সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করা। ১০ লাখ পরিবারের জন্য বিনামূল্যে সেবা নিশ্চিত করতে প্রায় এক হাজার কোটি ডলারের অর্থের প্রয়োজন। মামদানি এই অর্থ উচ্চবিত্তদের ওপর কর বাড়িয়ে জোগাড় করতে চান, যা আইনগতভাবে গভর্নর ক্যাথি হোকুলের সম্মতির ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার রাজনৈতিক সংঘাত শহরটির জন্য কেন্দ্রীয় তহবিল প্রাপ্তিতে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। তবে মামদানি দৃঢ়কণ্ঠে জানিয়েছেন, তিনি ছোট প্রত্যাশা করতে জানেন না এবং সাহসের সঙ্গে নিউইয়র্কবাসীর জীবনমান উন্নয়নে কাজ করে যাবেন।