শিক্ষার্থী নেই, তবুও কোটি টাকার বেতন চলছে এমপিওতে

নেত্রকোনার শিক্ষা ব্যবস্থায় বিজ্ঞান বিভাগের অস্তিত্ব বর্তমানে কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। মাধ্যমিক পর্যায়ে কিছু শিক্ষার্থী থাকলেও উচ্চমাধ্যমিকে উঠতেই বিজ্ঞান বিভাগে ভয়াবহ ভাটা নেমেছে। শ্রেণিকক্ষ ফাঁকা, ল্যাবের দরজা তালাবদ্ধ, যন্ত্রপাতি মরিচা ধরছে—তবু এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতন নিয়মিতভাবে সরকারি তহবিল থেকে প্রদান হচ্ছে। এই শিক্ষার্থীহীন বিভাগে প্রতিবছর কোটি টাকার সরকারি অর্থ অপচয় হচ্ছে।

জেলার ৪৫টি কলেজের মধ্যে সরকারি কলেজ ১১টি, এমপিওভুক্ত ১৯টি এবং নন-এমপিও ১৫টি। কিন্তু এমপিওভুক্ত কলেজের মধ্যে ৭টিতে বিজ্ঞানের কোনো বিভাগই নেই।

২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় সরকারি ও এমপিওভুক্ত কলেজ থেকে অংশ নেবে মোট ৬ হাজার ৮০১ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মাত্র ৯০৮ জন, যা মোট পরীক্ষার্থীর এক-ষষ্ঠাংশেরও কম।

বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকদের সংখ্যা সরকারি ও এমপিওভুক্ত ২৩টি কলেজে ১৩৬ জন। কিন্তু এর মধ্যে ১১টি কলেজে শিক্ষার্থী সংখ্যা ১০-এরও কম, আর একটি কলেজে শিক্ষার্থী শূন্য। গত তিন বছরের চিত্রও প্রায় একই। এ কলেজগুলোতে প্রতিবছর বিজ্ঞান বিভাগে ব্যয় হয় দুই কোটি টাকারও বেশি।

শিক্ষার্থীদের ৮০ শতাংশ মাধ্যমিকের পর বিজ্ঞান বিভাগ ছাড়ছে মানবিক বা বাণিজ্য বিভাগে। এর প্রধান কারণ—গণিত ও পদার্থবিজ্ঞান সম্পর্কিত ভয়, ল্যাবের অপ্রতুলতা, বাড়তি খরচ, অভিভাবকের আর্থিক সংকট এবং মানসম্মত শিক্ষক সংকট।

নেত্রকোনার কিছু কলেজের শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সংখ্যা এমন:

কলেজের নামশিক্ষার্থী (বিজ্ঞান)শিক্ষক (বিজ্ঞান)
মোহনগঞ্জ শহীদ স্মৃতি কলেজ04
মোহনগঞ্জ মহিলা কলেজ25
মদন সরকারি আজিজ খান কলেজ75
চন্দ্রনাথ কলেজ55
হেনা ইসলাম কলেজ54
আটপাড়া ডিগ্রি কলেজ25

পুরো জেলার বিজ্ঞান বিভাগের অর্ধেক শিক্ষার্থী আসে দুটি কলেজ থেকে—নেত্রকোণা সরকারি কলেজ ও নেত্রকোণা সরকারি মহিলা কলেজে মোট ৫৩০ জন।

ল্যাবের অবস্থাও নাজুক। অনেক কলেজে ল্যাব তালাবদ্ধ, কোথাও যন্ত্রপাতি নষ্ট, কোথাও ব্যবহারযোগ্য শিক্ষক নেই। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২০২১ সালের নীতিমালায় বলা হয়েছে, কলেজে বিজ্ঞান বিভাগ চালানোর জন্য ন্যূনতম ২০ শিক্ষার্থী থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবায়ন এখনো চোখে পড়েনি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাধ্যমিক থেকেই ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং, আধুনিক ল্যাব, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং ছাত্রশূন্য কলেজে শিক্ষক পুনর্বিন্যাস ছাড়া বিজ্ঞান শিক্ষার এই পতন আটকানো সম্ভব নয়।

জেলার অধ্যক্ষরা অভিযোগ করেছেন, রাজনৈতিক তদবিরে অধিকাংশ কলেজ এমপিওভুক্ত হয়। শিক্ষার্থী না থাকলেও শিক্ষক কমানো গেলে রাজনৈতিক চাপ আসে।

নেত্রকোনা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মো. আবু তাহের খান বলেন, “ছাত্রশূন্য কলেজগুলিতে বিজ্ঞান বিভাগ বন্ধ করে অন্য কলেজে একীভূত করা জরুরি। এতে সরকারের অর্থ অপচয় রোধ হবে।”

মাউশির ময়মনসিংহ অঞ্চলের পরিচালক এ. কে. এম. আলিফ উল্লাহ আহসান জানান, “এমপিওভুক্ত কলেজগুলোর শিক্ষকদের অন্য কলেজে বদলির সুযোগ নেই। আমরা যথাযথ ব্যবস্থা ও নির্দেশনা দেবো যাতে শিক্ষার্থী বৃদ্ধি ও সরকারি অর্থের অপচয় রোধ করা যায়।”