রেকর্ড রেমিট্যান্স ও রিজার্ভে দেশের অর্থনীতিতে স্বস্তির সুবাতাস

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ডিসেম্বরের শেষ প্রহরে অভাবনীয় সুসংবাদ বয়ে এনেছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। চলতি মাসের মাত্র ২৯ দিনেই দেশে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স আসার পরিমাণ ৩ বিলিয়ন (৩০০ কোটি) ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। রেমিট্যান্সের এই শক্তিশালী প্রবাহের ওপর ভর করে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বৈদেশিক মুদ্রার মোট রিজার্ভ বর্তমানে ৩৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থান। বৈদেশিক মুদ্রার এই ক্রমবর্ধমান মজুদ দেশের আর্থিক খাতের অস্থিরতা কাটিয়ে উঠতে এবং ডলারের বাজার স্থিতিশীল রাখতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করছে।

প্রবাসী আয়ের এই ইতিবাচক ধারা গত বছরের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই অব্যাহত রয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ডিসেম্বরের প্রথম ২৯ দিনে দেশে ৩০৪ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে। এর আগে একক কোনো মাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আসার রেকর্ড ছিল গত মার্চ মাসে, যার পরিমাণ ছিল ৩২৯ কোটি ডলার। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত মোট ৩ হাজার ৩৩ কোটি ডলারের প্রবাসী আয় দেশে এসেছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। হুন্ডি প্রতিরোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর অবস্থান এবং বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রেরণে উৎসাহ প্রদানই এই সাফল্যের প্রধান কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।

রিজার্ভের পরিস্থিতির দিকে নজর দিলে দেখা যায়, মঙ্গলবার পর্যন্ত দেশের মোট গ্রস রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩১৮ কোটি ডলারে। আইএমএফ-এর হিসাব পদ্ধতি (বিপিএম-৬) অনুযায়ী এর পরিমাণ ২ হাজার ৮৫১ কোটি ডলার। উল্লেখ্য, ২০২১ সালে দেশের রিজার্ভ রেকর্ড ৪৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল, তবে বিগত সরকারের শেষ সময়ে তা ২৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়োপযোগী পদক্ষেপ এবং ব্যাংকগুলো থেকে ডলার ক্রয়ের নীতির ফলে রিজার্ভ আবার শক্তিশালী অবস্থানে ফিরতে শুরু করেছে।

রেমিট্যান্স ও রিজার্ভের বর্তমান চিত্র এক নজরে:

নির্দেশকসমূহবর্তমান পরিসংখ্যান (ডিসেম্বর ২০২৫)ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও তথ্য
মাসিক রেমিট্যান্স প্রবাহ৩০৪ কোটি ডলার (২৯ দিনে)৩২৯ কোটি ডলার (মার্চ ২০২৪ – রেকর্ড)
মোট গ্রস রিজার্ভ৩৩.১৮ বিলিয়ন ডলার২৬ বিলিয়ন ডলার (আগস্ট ২০২৪)
বিপিএম-৬ রিজার্ভ২৮.৫১ বিলিয়ন ডলার৪৮ বিলিয়ন ডলার (২০২১ – সর্বোচ্চ)
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার ক্রয়৩১৩ কোটি ডলার (গত ৬ মাসে)১ বিলিয়ন ডলার (শুধুমাত্র ডিসেম্বরে)
ডলারের বর্তমান বিনিময় হার১২২ টাকা ৩০ পয়সা

বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে বাজার থেকে ডলার সংগ্রহ করে রিজার্ভ শক্তিশালী করার কৌশল অবলম্বন করছে। গত মঙ্গলবারও সাতটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ৮ কোটি ৯০ লাখ ডলার কেনা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মোট ৩ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার বাজার থেকে সংগ্রহ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর সম্প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ডিসেম্বর মাস শেষ হওয়ার আগেই রিজার্ভের পরিমাণ ৩৪ থেকে ৩৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কোনো বিদেশি সংস্থার ঋণের ওপর নির্ভর না করে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ডলার কিনেই এই সমৃদ্ধি অর্জন করা হচ্ছে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রিজার্ভের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেশের আমদানিকারকদের জন্য বড় স্বস্তি নিয়ে আসবে, ফলে পণ্য আমদানির এলসি বা ঋণপত্র খোলা আরও সহজতর হবে। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার পর্যাপ্ত মজুদ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়তা করবে। যদি রেমিট্যান্সের এই জোয়ার এবং ডলার কেনার ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, তবে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি খুব দ্রুতই একটি টেকসই ও মজবুত ভিতের ওপর দাঁড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে।